সোমবার গভীর রাতে সংঘটিত এই ভয়াবহ হামলার তথ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে এমন নজিরবিহীন আক্রমণ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্য ও নৌ-নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক চরম শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
ওমানের জলসীমার অতি সন্নিকটে ঘটা এই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের সামগ্রিক নিরাপত্তাকে এক নতুন ও বিপজ্জনক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়া সুপারট্যাংকার দুটি গত সপ্তাহে সৌদি আরবের অন্যতম প্রধান জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে প্রায় বিশ লাখ ব্যারেল করে মোট চল্লিশ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বোঝাই করেছিল।
উল্লেখ্য যে, পারস্য উপসাগরে নানামুখী নিরাপত্তাঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও গত আগস্ট মাসে প্রণালির অভ্যন্তরীণ এলাকা থেকে পুনরায় তেল লোড ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাণিজ্যিক সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করেছিল সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকো।
তবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি নিয়ে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় প্রবেশের পূর্বমুহূর্তেই জাহাজ দুটি এই অতর্কিত ও ধ্বংসাত্মক হামলার মুখে পড়ে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিশদ প্রতিবেদন অনুসারে, হামলার শিকার প্রথম জাহাজটি ছিল সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা বহনকারী ‘সিদর’ নামের একটি সুবিশাল অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ বা ভিএলসিসি।
সোমবার ভোরের দিকে ওমানের খাসাব উপকূল থেকে আনুমানিক ১৬.৬ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে অজ্ঞাত কোনো লক্ষ্যভেদী বস্তুর আঘাতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে খাসাব উপকূল থেকে প্রায় ১৭ নটিক্যাল মাইল পূর্বে লিবিয়ার পতাকাবাহী ‘সেনেগাল প্রসপারিটি’ নামের অপর একটি সুবিশাল তেলের ট্যাংকারে পরপর তিনটি অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র সজোরে আঘাত হানে।
আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থা ম্যারিস্কস জানিয়েছে, বিস্ফোরণের তীব্রতায় জাহাজগুলোর কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও সৌভাগ্যবশত জাহাজে অবস্থানরত সকল নাবিক ও ক্রু সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও অক্ষত রয়েছেন।
পাশাপাশি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক বাণিজ্য তদারকি সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) স্বাধীনভাবে জানিয়েছে যে, প্রণালি ছেড়ে যাওয়ার সময় একটি তেলের ট্যাংকারে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
তবে ঘটনার পর সিদরের পরিচালনাকারী সংস্থা ‘বাহরি’ এবং সেনেগাল প্রসপারিটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘সিনোকোর’-এর সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত সংকীর্ণ জলপথটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই জলপথের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা নিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ধারাবাহিক সামরিক কড়াকড়ি ও অবরোধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্বাভাবিক জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষ করে ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ সামরিক অভিযান এবং এর জবাবে তেহরানের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের পর এই অতি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সচল রাখতে মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ কাতার ও ওমান কূটনৈতিক মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে আসছিল।
তবে উভয়পক্ষের অনমনীয় মনোভাবের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমঝোতা বা স্থায়ী শান্তির রূপরেখা আলোর মুখ দেখেনি। গত জুলাই মাসের শেষভাগের পর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সরাসরি পাল্টাপাল্টি গুলিবর্ষণ ও সামরিক সংঘাতের ঘটনা নতুন করে উত্তেজনা উসকে দিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করায় মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সার্বিক পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। এর আগে মঙ্গলবার সকালের দিকে ইরানের স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয় যে, হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ করিডোর অতিক্রম করার সময় সৌদি আরবের একটি তেলের ট্যাংকারকে ইরানি নিরাপত্তা বাহিনী পথরোধ ও আটক করেছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের সবচেয়ে ব্যস্ততম এই নৌপথে একের পর এক লক্ষ্যভেদী হামলার ঘটনা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ ও নিরাপদ চলাচল দ্রুত নিশ্চিত করা না গেলে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের জন্ম দেবে।