তাই কূটনৈতিক আলোচনা বা অন্য কোনো অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র যদি নিজেদের অন্যায় দাবি ও শর্তগুলো তেহরানের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে ইরান কোনোভাবেই সেই আধিপত্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে না।
মঙ্গলবার রাজধানী তেহরানে আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি তার দেশের এই আপসহীন ও বলিষ্ঠ অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন ইসমাইল বাকায়ি। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বমঞ্চের যে কোনো জটিল পরিস্থিতি এবং কূটনৈতিক সংকটকে কেবল দেশের জাতীয় কল্যাণ ও স্বাধীন স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেই অত্যন্ত নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করে থাকে।
সেই মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেহরান নিজেদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান তুলে ধরে। তবে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণের এই প্রক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না; বরং দেশের সর্বোচ্চ ও বৈধ সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ চুলচেরা বিশ্লেষণের পর যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল সেই নির্দেশনার আলোকেই নিজেদের পরবর্তী কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করে থাকে।
এটি মূলত প্রমাণ করে যে, বিদেশি কোনো পরাশক্তির রক্তচক্ষু বা নির্দেশনার কাছে মাথা নত না করে ইরান তার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাশীল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচনা করে ইরানি মুখপাত্র বলেন, ওয়াশিংটন তাদের ইতিহাসে প্রায় প্রতিবারই কোনো না কোনো মিথ্যা অজুহাত ও বানোয়াট কারণ দেখিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর ওপর আগ্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে।
কিন্তু ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ক্ষেত্রে তারা যতবারই এমন হঠকারী পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছে, প্রতিবারই তেহরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ও সমুচিত জবাব পেয়েছে। বাকায়ি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কেবল তাদের অসৎ ও আধিপত্যবাদী উদ্দেশ্যেরই প্রমাণ বহন করে না; বরং এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে মার্কিনিরা বর্তমানে চরম বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক হতাশার মধ্যে ভুগছে।
অতিরিক্ত দাবি আদায়ের নেশায় মত্ত ওয়াশিংটন মূলত 'কূটনৈতিক আলোচনা'র প্রকৃত অর্থকে নিজেদের একতরফা 'শর্ত চাপিয়ে দেওয়া'র সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে গুলিয়ে ফেলেছে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সতর্ক করে দেন যে, কূটনীতির নামে পরাশক্তির এমন বলপ্রয়োগ ও খবরদারির পদ্ধতি স্বাধীন ও সার্বভৌম ইরানের ক্ষেত্রে অতীতেও যেমন সফল হয়নি, ভবিষ্যতেও কোনোভাবেই কার্যকর হবে না।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার নেপথ্য কারণগুলোও অত্যন্ত সুচারুভাবে বিশ্লেষণ করেন ইসমাইল বাকায়ি। তার মতে, বিশ্বজুড়ে ওয়াশিংটনের ধারাবাহিক কৌশলগত ভুল হিসাব-নিকাশ এবং ভ্রান্ত নীতির কারণেই আজ তারা এতটা কোণঠাসা।
বিশেষ করে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানসহ স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অযৌক্তিক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা এবং কোনো না কোনোভাবে গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্বকে সেই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে টেনে নেওয়ার যে অপচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করেছে, তার চরম মূল্য এখন তাদের নিজেদেরকেই চোকাতে হচ্ছে।
এই অন্তহীন সংঘাত ও বেপরোয়া পররাষ্ট্রনীতির কারণেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আমেরিকা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত, ক্লান্ত এবং দুর্বল একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক আগ্রাসন ও শত্রুতামূলক তৎপরতা চালিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে সেগুলোকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেন ইসমাইল বাকায়ি।
তিনি অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন সামরিক আগ্রাসনের সময় যে প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছে বা হামলার নির্দেশ দিয়েছে, তেহরানের দৃষ্টিতে তার প্রতিটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও অকাট্য উদাহরণ।
কারণ, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই অঘোষিত যুদ্ধের কোনো আইনি, নৈতিক বা আন্তর্জাতিক ভিত্তি ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণ অন্যায়, অযৌক্তিক এবং জাতিসংঘের সনদের পরিপন্থি একটি অবৈধ আগ্রাসন।
আর আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো বেআইনি ও অন্যায় যুদ্ধে সংঘটিত সকল ধরনের সামরিক কর্মকাণ্ডই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বৈশ্বিক আদালতে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য। পরিশেষে, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাধীন নীতি থেকে ইরান যে একচুলও সরে আসবে না, সেই বার্তাই অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ধ্বনিত হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতির মাধ্যমে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসমাইল বাকায়ির এই সময়োপযোগী ও বলিষ্ঠ বক্তব্য মূলত পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের প্রতি তেহরানের একটি অত্যন্ত কঠোর ও সরাসরি সতর্কবার্তা।
এর মাধ্যমে ইরান বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিল যে, পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে যেকোনো গঠনমূলক আলোচনার জন্য তেহরানের দরজা খোলা থাকলেও, জোরজুলুম বা ভয়ভীতি দেখিয়ে ইরানের কাছ থেকে কোনো অন্যায় সুবিধা আদায় করার মার্কিন স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়িত হবে না।