শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুয়েতে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম

কুয়েতে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলা
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই এবার কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ হামলার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে পরিচালিত এই সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বেশ কয়েকজন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইরানি বাহিনীটি।

 

একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক ড্রোন ধ্বংস করার কথাও অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে পরিচালিত এই আকস্মিক ও তীব্র আক্রমণ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

আইআরজিসি তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই সামরিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, তাদের সুদক্ষ স্থলবাহিনী অত্যন্ত নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে কুয়েতের ওই বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত শীর্ষ মার্কিন কমান্ডারের সদর দপ্তর এবং সামরিক সদস্যদের আবাসনকেন্দ্র লক্ষ্য করে এই সমন্বিত আক্রমণ পরিচালনা করে।

 

বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, এই অতর্কিত হামলায় বেশ কয়েকজন মার্কিন সামরিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং ঘাঁটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার বিষয়ে আইআরজিসি আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেছে।

 

তাদের দাবি অনুযায়ী, মুহুর্মুহু এই হামলায় বিমানঘাঁটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ড্রোন হ্যাঙ্গার এবং ড্রোন মোতায়েনের একটি সুনির্দিষ্ট র‍্যাম্পে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকটি মার্কিন ড্রোনও সেখানে অবস্থান করছিল, যা এই আগুনে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ইরানি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।

 

এই হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বৃহত্তর ও সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনার অংশ। আইআরজিসির বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র কুয়েতেই নয়, বরং একই সময়ে জর্ডান, বাহরাইন এবং ইরাকের ইরবিলে অবস্থিত অন্যান্য মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও একযোগে অনুরূপ হামলা চালানো হয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ করে ইরানের এই বহুমুখী আক্রমণ দুই দেশের মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্বকে এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে। ইরানের এই ভয়াবহ পাল্টা আক্রমণের পেছনে মূল কারণ হিসেবে একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

আইআরজিসির দাবি, সম্প্রতি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর সিরিকে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র যে অমানবিক হামলা চালিয়েছে, মূলত তারই প্রত্যক্ষ প্রতিশোধ হিসেবে এই সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। স্মরণযোগ্য যে, ওই বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় অন্তত চারজন নিরীহ মানুষ নিহত এবং পঞ্চাশ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন।

 

নিহতদের মধ্যে একজন নিষ্পাপ শিশুও রয়েছে বলে ইরানি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে। এই ঘটনার পর থেকেই ইরানে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং সামরিক জবাব দেওয়ার চাপ বাড়তে থাকে।

 

প্রতিবেশী দেশ কুয়েতের সাধারণ জনগণের মধ্যে যাতে কোনো ধরনের আতঙ্ক বা ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি না হয়, সেদিকেও ইরান বিশেষ দৃষ্টি রেখেছে। আইআরজিসি তাদের বিবৃতির একটি অংশে সরাসরি কুয়েতের জনগণের উদ্দেশে একটি বিশেষ বার্তা প্রদান করেছে।

 

সেখানে তারা অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তাদের এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য কোনোভাবেই কুয়েতের সাধারণ নাগরিক বা সেদেশের সার্বভৌমত্ব নয়। বরং, কুয়েতের মাটিতে অবস্থান করা মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং তাদের স্থাপনাই ছিল এই হামলার একমাত্র লক্ষ্যবস্তু।

 

একই সঙ্গে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে কুয়েত থেকে অনতিবিলম্বে সকল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের জন্য জোর আহ্বান জানিয়েছে ইরানি এই সামরিক সংগঠনটি।

 

বর্তমান এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে যখন এর আগে মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, তারা ইরানের অভ্যন্তরে আইআরজিসির বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার পরপরই ইরানি গণমাধ্যমগুলোতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভয়াবহ বিস্ফোরণের খবর প্রকাশিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে কৌশলগত এলাকা যেমন কেশম দ্বীপ, বান্দার আব্বাস, সিরিক, চাবাহার এবং কোনারাকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত এই তথ্যাবলি স্পষ্টতই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যকার এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের নাজুক পরিস্থিতিকে খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।

 

একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ এবং অন্যদিকে ইরানের প্রতিশোধমূলক বহুমুখী আক্রমণ-উভয় মিলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এক চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপর এক সুদূরপ্রসারী ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

- আনাদোলু এজেন্সি