আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই আকস্মিক সংঘর্ষের পর থেকে ১০ জন ক্রুসহ একটি পণ্যবাহী জাহাজ সম্পূর্ণভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছে। দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত ওই জাহাজটি বা এর ভেতরে অবস্থানরত নাবিকদের কোনো সন্ধান মেলাতে পারেনি তুরস্কের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড।
গভীর রাতের অন্ধকারে ঘটা এই দুর্ঘটনা পুরো সামুদ্রিক পরিবহন খাতে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে এবং নিখোঁজ নাবিকদের ভাগ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সময় রাত আনুমানিক ৩টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
যখন চারদিক গভীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে এই ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনাটি ঘটে। সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া জাহাজ দুটির একটি হলো সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ ‘তুগবের্গ ইমামোগলু’ এবং অন্যটি হলো রাসায়নিক পদার্থ বহনকারী বিশালাকার ট্যাংকার ‘আলসু’।
দুর্ঘটনার পরপরই ‘তুগবের্গ ইমামোগলু’ জাহাজটি তার ১০ জন ক্রুসহ রাডারের বাইরে চলে যায় এবং এর সঙ্গে সব ধরনের বেতার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, বিস্ময়করভাবে রাসায়নিকবাহী ট্যাংকার ‘আলসু’র কোনো কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি বলে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ট্যাংকারটি অক্ষত থাকায় মারমারা সাগরে একটি সম্ভাব্য ও ভয়াবহ রাসায়নিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে বলে মনে করছেন পরিবেশ ও সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞরা। ইস্তাম্বুলের গভর্নর দপ্তর থেকে এরই মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে।
ওই বিবৃতিতে নিখোঁজ জাহাজের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, পণ্যবাহী জাহাজ তুগবের্গ ইমামোগলু এবং এর ভেতরে অবস্থানরত দশজন ক্রুর সঙ্গে এই মুহূর্তে কোনোভাবেই যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।
জাহাজটির অবস্থান শনাক্ত করতে এবং আটকে পড়া নাবিকদের উদ্ধারে বর্তমানে অন্যান্য জাহাজ ও বেশ কয়েকটি হেলিকপ্টার নিরলসভাবে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের এই বিবৃতি থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং উদ্ধারকর্মীরা নিখোঁজ নাবিকদের সন্ধানে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
নিখোঁজ ক্রুদের সন্ধানে তুরস্কের উদ্ধারকারী দলগুলো এক বিশাল তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে। মারমারা সাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে কোস্টগার্ডের একাধিক দ্রুতগামী নৌযান এবং আকাশপথে নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার একযোগে টহল দিচ্ছে।
বিশেষায়িত সোনার প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক রাডার ব্যবস্থা ব্যবহার করে সমুদ্রের তলদেশে এবং উপরিভাগে নিখোঁজ জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ বা ভাসমান কোনো অংশের সন্ধান করা হচ্ছে। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার অভিযানের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
তবে সমুদ্রের বিশালতা এবং স্রোতের কারণে উদ্ধারকাজ বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ ক্রুদের পরিবারগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে এবং তারা উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষের দিকে অধীর আগ্রহে চেয়ে আছেন কোনো ইতিবাচক খবরের আশায়।
ভৌগোলিক দিক থেকে মারমারা সাগর তুরস্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জলপথ। এটি কৃষ্ণ সাগর এবং এজিয়ান সাগরকে সংযুক্ত করার কারণে এখানে সারা বছরই দেশি-বিদেশি অসংখ্য বাণিজ্যিক জাহাজের ব্যাপক আনাগোনা থাকে। অতিরিক্ত সামুদ্রিক যান চলাচলের কারণে এই জলপথে নৌ দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবসময়ই একটু বেশি থাকে।
বিশেষ করে রাতের বেলায় দিকভ্রম বা সিগন্যাল বুঝতে ভুল হওয়ার কারণে অনেক সময় এমন বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। তবে ঠিক কী কারণে এবং কাদের গাফিলতিতে এই দুটি জাহাজের মধ্যে এমন ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটল, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
তুরস্কের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত শুরু করেছে। তারা ট্যাংকার ‘আলসু’র নাবিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করার পাশাপাশি অন্যান্য নেভিগেশন ডেটা বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার পেছনের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা চালাবেন।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক প্রোটোকল যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আপাতত সবার মূল লক্ষ্য হলো নিখোঁজ ১০ জন নাবিককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ধার করা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই উদ্ধার অভিযানের দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছে।