আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই ঘটনার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বেসামরিক স্থাপনা ও সামাজিক অনুষ্ঠানে এ ধরনের সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে ইরান।
গত মঙ্গলবার রাতে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির অন্তর্গত কুহেশতাক শহরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন বাহিনী অতর্কিত এই হামলা চালায়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত চারজন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং পঞ্চাশ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।
বিয়ের মতো একটি আনন্দঘন সামাজিক অনুষ্ঠান মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় বিষাদ ও কান্নার রোল ওঠা এক ধ্বংসস্তূপে। নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই হামলার ঘটনা সমগ্র ইরানে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
স্পিকার ঘালিবাফ এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, নিরীহ মানুষের ওপর এ ধরনের বর্বরতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চরম মূল্য চোকাতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ ও আবেগঘন বার্তায় স্পিকার ঘালিবাফ শুধু কুহেশতাক শহরের হামলাই নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাহিনীর চালানো আরও বেশ কয়েকটি নৃশংস হামলার ইতিহাস তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মিনাব শহরে মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালানো ভয়াবহ বোমা হামলার কথা স্মরণ করেন। ওই বর্বরোচিত হামলায় ১৭০ জনেরও বেশি নিষ্পাপ কন্যাশিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল।
একই সঙ্গে তিনি ল্যাম্পার্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্সে চালানো আরেকটি সামরিক আগ্রাসনের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে বেশ কয়েক ডজন উদীয়মান অ্যাথলেট ও ক্রীড়াবিদ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের ওপর ধারাবাহিকভাবে চালানো এসব হত্যাকাণ্ডকে তিনি মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ধারাবাহিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ঘালিবাফ তাঁর বার্তায় লিখেছেন, মিনাবের স্কুলে শিশুদের নির্বিচারে গণহত্যা করা হয়েছে। ল্যাম্পার্ড স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ক্রীড়াবিদদের হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ কুহেশতাকের বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শিশুদেরও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যদি কোনো পরাশক্তি শয়তানের মতো আচরণ করে, শয়তানের মতো সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানায় এবং শয়তানের মতো নির্বিচারে নিরীহ মানুষ হত্যা করে, তবে সেই রাষ্ট্রকে একটি প্রকৃত শয়তান ছাড়া আর কী বলা যায়? তাঁর এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এই দীর্ঘ বার্তায় ঘালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তাদের প্রধান মিত্র ইসরায়েলকেও কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি ইসরায়েলকে ‘ছোট শয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সবচেয়ে বড় শয়তান হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এই ছোট শয়তানটিকে সব ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষা প্রদান করে আসছে।
ইসরায়েলও মধ্যপ্রাচ্যে ঠিক একই ধরনের ধ্বংসাত্মক ও অমানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মূল মদতদাতা হলো যুক্তরাষ্ট্র। স্পিকারের এই বক্তব্য মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত এবং লেবানন ও সিরিয়ায় মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিই ইঙ্গিত করে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে 'শয়তান' বা 'গ্রেট স্যাটান' শব্দগুচ্ছের ব্যবহার একেবারেই নতুন নয়। ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের শীর্ষ নেতারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সাম্রাজ্যবাদী নীতি, মধ্যপ্রাচ্যে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে এই উপাধিতে ভূষিত করে আসছেন।
তবে স্পিকার ঘালিবাফের সাম্প্রতিক এই মন্তব্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ও আবেগময়। কারণ, এবার সরাসরি নারী, শিশু এবং ক্রীড়াবিদদের মতো সমাজের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও নিরীহ অংশটি মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের নির্মম শিকারে পরিণত হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাবলি ইরানের জাতীয় শোককে যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরও সুসংহত করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একজোট হতে বাধ্য করেছে। এদিকে, গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক হামলায় ইরানে এক ডজনেরও বেশি সাধারণ মানুষের প্রাণহানির পর ইরানও বসে নেই।
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের হত্যার প্রতিশোধ নিতে ইরান এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো ও ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল এখন এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই কার্যকর ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানিয়েছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা।