বুধবার (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ২০২৩ সাল থেকে দ্বিপক্ষীয় সামরিক চুক্তির আওতায় এই সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। এই অংশীদারত্ব কেবল দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককেই দৃঢ় করছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণ পাল্টে দিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও রণতরীর জন্য এক নতুন ও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ করা হয়েছে যে, রাশিয়ার গোপন সরকারি নথি, সামরিক পেটেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভ্রমণের রেকর্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করার পরেই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটিত হয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এই কর্মসূচিকে সাম্প্রতিক সময়ে মস্কো থেকে তেহরানের কাছে সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের অন্যতম প্রকাশ্য, গভীর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেছে।
এর আগে গত কয়েক দশকে ইরান বিভিন্ন মাধ্যম থেকে এই উন্নত প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা চালালেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। বর্তমানে যৌথ এই উদ্যোগে রাশিয়ার বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও প্রযুক্তিবিদ সরাসরি যুক্ত রয়েছেন, যারা ইরানের সামরিক বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।
এই যৌথ সামরিক প্রযুক্তির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অত্যাধুনিক ‘রেমজ্যাট’ ইঞ্জিন ব্যবস্থা। এই বিশেষ প্রপালশন প্রযুক্তির কল্যাণে নবনির্মিত ক্রুজ মিসাইলগুলো সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় শব্দের বেগের চেয়ে বহুগুণ বেশি গতিতে ছুটে গিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত কম সময়ে শত্রুর ওপর হামলা চালাতে এই সুপারসনিক গতি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। সামরিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, ইরান ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে বেশ কিছু সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল তৈরি এবং পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণও সম্পন্ন করেছে।
তবে এখন পর্যন্ত চলমান আঞ্চলিক কোনো সংঘাতে এই বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বা গণমাধ্যমের হাতে এসে পৌঁছায়নি। মিসাইল প্রযুক্তি বিষয়ক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ ফাবিয়ান হিনজ এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানান যে, এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং যুগান্তকারী একটি সামরিক প্রযুক্তি, যা অর্জনের জন্য ইরান দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মস্কোর কাছে তাগিদ দিয়ে আসছে।
তিনি আরও স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য খোদ রুশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় বা রাজনৈতিক অঙ্গনের উচ্চস্তর থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন আসতে হয়েছে।
এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে মস্কো ও তেহরান এখন সামরিক ক্ষেত্রে তাদের পারস্পরিক দূরত্ব ঘুচিয়ে আরও অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগত মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও ইরানের এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, বিমানবাহিনী এবং যুদ্ধজাহাজগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
যদি এই সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইলগুলো নিয়মিত সামরিক কার্যক্রমে পুরোপুরি যুক্ত হয়, তবে পারস্য উপসাগর বা আশপাশের জলসীমায় মার্কিন রণতরীগুলোর স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে শব্দের চেয়ে দ্রুতগতির এই মিসাইলগুলোর গতি রোধ করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। ফলে দুই দেশের এই গোপন ও কৌশলগত মৈত্রী আগামী দিনে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা।