শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হরমুজ প্রণালিতে সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

হরমুজ প্রণালিতে সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা!
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জলপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সময় সৌদি আরবের একটি বৃহৎ বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই আকস্মিক ও প্রাণঘাতী হামলায় ওই জাহাজে কর্মরত অন্তত দুজন নাবিক মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন।

 

বুধবার সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশ্বের অন্যতম প্রধান জাতীয় জাহাজ পরিচালনাকারী কোম্পানি 'বাহরি' আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার তথ্য নিশ্চিত করেছে। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় হামলায় নিহত ওই দুই নাবিকই ফিলিপাইনের নাগরিক ছিলেন।

 

তবে ঠিক কী কারণে এবং কাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এই প্রাণঘাতী হামলা চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে সৌদি আরবের এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করেনি। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই ঘটনা নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

হামলার ধরন ও প্রকৃতি সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা 'ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস' বা ইউকেএমটিও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

 

সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালির মতো একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে একটি তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর অন্তত তিনটি অজানা বা অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

 

এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোথা থেকে বা কোন দিক থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে এই হামলার কারণে জাহাজের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং ওই সামুদ্রিক রুটে চলাচলকারী অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

 

বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, তাই এখানে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেজন্য পশ্চিমা দেশগুলো এই জলপথের নিরাপত্তার ওপর সবসময়ই বিশেষ গুরুত্বারোপ করে থাকে। এই অঞ্চলে সামুদ্রিক উত্তেজনার একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রেক্ষাপট রয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভিজাত সামরিক শাখা 'ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী' বা আইআরজিসি এই অঞ্চলে চলাচলকারী বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিল।

 

আইআরজিসির পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে কোনো তেলবাহী ট্যাংকার বা বাণিজ্যিক জাহাজ যদি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সংকীর্ণ এই জলপথ পার হওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

যদিও সাম্প্রতিক এই হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি, তবে আইআরজিসির পূর্ববর্তী হুমকির কারণে পুরো বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

 

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলবে। বিশেষ করে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এই ধরনের সামুদ্রিক সংঘাতের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পেতে পারে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

 

উদ্ভূত এই সংকটময় পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে 'বাহরি' তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করেছে যে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজে অবস্থানরত অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছে। জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের মানসিক সমর্থন প্রদানকে বর্তমানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

 

একই সঙ্গে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ, নৌ-নিরাপত্তা প্রদানকারী সংস্থা এবং সামুদ্রিক খাতের অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সমন্বয় ও তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে।

 

সৌদি কর্তৃপক্ষ পুরো পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরবর্তী যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আইন অনুযায়ী, সমুদ্রে বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অনেকটাই হুমকির সম্মুখীন।

 

হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের অঞ্চলে সৌদি আরবের বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ঠিক এক মাস আগেও হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অঞ্চলে বাহরির মালিকানাধীন আরও একটি বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছিল।

 

ওই সময়ে 'ওয়াদিয়ান' নামের একটি সুপারট্যাংকার ওমান উপকূলের খুব কাছ দিয়ে চলাচল করার সময় আকস্মিক আক্রমণের মুখে পড়ে। একের পর এক এ ধরনের সামুদ্রিক হামলা ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

 

বৈশ্বিক জাহাজ পরিচালনা কোম্পানিগুলো এখন এই রুট ব্যবহারে বিকল্প চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়ে দিতে পারে। এর পাশাপাশি লোহিত সাগর অঞ্চলে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতাও সৌদি আরবের সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য একটি বড় ধরনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

এর আগে, হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে নৌ অবরোধ ঘোষণার পর লোহিত সাগরে বাহরির মালিকানাধীন 'আমজান' এবং 'মাসা' নামের আরও দুটি জাহাজ পরপর ভয়াবহ হামলার শিকার হয়।

 

ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও হুথি বিদ্রোহীদের এই বেপরোয়া পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ধারাবাহিক এই হামলাগুলো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোতে বাণিজ্যিক জাহাজের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হবে।

 

- রয়টার্স