শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শত্রুদের ভিত নাড়িয়ে দেবে ইরানের নতুন ত্রিমুখী কৌশল: মোহসেন রেজায়ি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫২ পিএম

শত্রুদের ভিত নাড়িয়ে দেবে ইরানের নতুন ত্রিমুখী কৌশল: মোহসেন রেজায়ি
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই শত্রুপক্ষের উদ্দেশে অত্যন্ত কড়া ও দ্ব্যর্থহীন সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম নীতিনির্ধারক ও সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই যুদ্ধক্ষেত্র, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলার ক্ষেত্রে তেহরানের নতুন ও অভাবনীয় কৌশল উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।

 

এই ত্রিমুখী ও যুগান্তকারী কৌশল শত্রুদের ভিতকে পুরোপুরি ধসিয়ে দেবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে সতর্ক করেছেন। বুধবার নিজের দাপ্তরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় তিনি পশ্চিমা পরাশক্তি ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি এই প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি প্রদান করেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই বার্তা নিছক কোনো ফাঁকা বুলি নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতিরই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবি-এর সংবাদ ও তথ্যসূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পার্সটুডে জানিয়েছে, মেজর জেনারেল রেজায়ি তাঁর বার্তায় প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ করে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসী ভাষা ব্যবহার করেছেন।

 

পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ও তাদের মিত্রদের বর্তমান আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, তারা যতই আস্ফালন করুক না কেন, নিজেদের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে তারা ইতিমধ্যেই নিজেদের জন্য যে এক ভয়ংকর নরক বা ফাঁদ তৈরি করেছে, তার অতল গহ্বর থেকে তারা কোনোভাবেই আর বের হতে পারবে না।

 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত, ফিলিস্তিন সংকট এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে পশ্চিমা মদতপুষ্ট বাহিনীর ব্যর্থতার দিকে ইঙ্গিত করেই সম্ভবত তিনি এই মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, শত্রুদের এই ফাঁদ থেকে উদ্ধারের কোনো পথ খোলা নেই, বরং পরিস্থিতি তাদের জন্য আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে।

 

নতুন কৌশলের প্রথম ধাপ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেছেন এই জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা। বিগত কয়েক দশকে ইরান নিজেদের সামরিক সক্ষমতাকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

 

নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল, শক্তিশালী ড্রোন বহর এবং অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশলের মাধ্যমে ইরান আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্যে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে।

 

মেজর জেনারেল রেজায়ির বক্তব্য থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, সম্মুখ সমরে বা যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন মোকাবিলায় তেহরান এখন নতুন ও অত্যন্ত প্রাণঘাতী কৌশল প্রয়োগ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

 

পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি কিংবা বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো রণাঙ্গনে শত্রুদের যেকোনো ধরনের উসকানির চূড়ান্ত জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত, সেই বার্তাই এখানে ফুটে উঠেছে।

 

যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনেও তেহরানের নতুন কৌশলের কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন মোহসেন রেজায়ি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান পশ্চিমাদের একঘরে করার নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে।

 

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা ব্রিকসের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জোটে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি এবং প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে ইরান এক নতুন কূটনৈতিক দিগন্তের সূচনা করেছে।

 

রেজায়ির সতর্কতা অনুযায়ী, আগামী দিনগুলোতে ইরানের এই কূটনৈতিক আক্রমণ আরও তীব্র হবে, যা পশ্চিমা বলয়ের একাধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে এবং তাদের মিত্রদের মাঝে চরম বিভাজন ও হতাশা সৃষ্টি করবে।

 

ইরানের এই নতুন কৌশলের তৃতীয় ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো অর্থনৈতিক অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরোপিত ইতিহাসের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে দাঁড়িয়েও ইরান নিজেদের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

'প্রতিরোধ অর্থনীতি' নীতির ওপর ভিত্তি করে তেহরান এখন শুধু নিষেধাজ্ঞার প্রভাবই কাটিয়ে ওঠেনি, বরং নতুন বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে নিজস্ব অর্থব্যবস্থায় বাণিজ্যের নতুন নতুন পথ তৈরি করেছে।

 

মেজর জেনারেল রেজায়ির হুঁশিয়ারি স্পষ্ট করে দেয় যে, শত্রুদের অর্থনৈতিক চাপকে ইরান এখন নিজেদের স্বনির্ভরতা অর্জন এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক আধিপত্যের ভিত ধসিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবেই অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করতে যাচ্ছে।

 

সার্বিকভাবে, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিবের এই বার্তা বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও সামরিক আবহে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং এটি ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা।

 

যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ধরনের চরম অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে, ঠিক তখনই সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফ্রন্টে নতুন কৌশলের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নতুন করে হিসাব-নিকাশ কষতে বাধ্য করবে।

 

তেহরানের এই আত্মবিশ্বাস ও আসন্ন কৌশলগত পদক্ষেপগুলো আগামী দিনগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে কতটা গভীর প্রভাব ফেলবে, এখন সেদিকেই সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন সারা বিশ্বের ভূ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

 

- পার্সটুডে