রবিবার, ডিসেম্বর ৭, ২০২৫
২২ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নেতানিয়াহু সরকারকে ‘ভয়ঙ্কর’ আখ্যা দিলেন রেডিওহেড তারকা থম ইয়র্ক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৫, ০৬:৫৬ পিএম

নেতানিয়াহু সরকারকে ‘ভয়ঙ্কর’ আখ্যা দিলেন রেডিওহেড তারকা থম ইয়র্ক
ছবি: Reuters

বিখ্যাত ব্রিটিশ রক ব্যান্ড রেডিয়োহেড-এর প্রধান শিল্পী থম ইয়র্ক সম্প্রতি এক সুস্পষ্ট মন্তব্যের মাধ্যমে জানিয়েছেন যে তিনি আর কখনোই ইসরায়েলে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন না। প্রখ্যাত সংগীতশিল্পীর এই সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এলো, যখন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রায় আট বছর আগে, ফিলিস্তিন-পন্থী আন্দোলনকারীদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও ব্যান্ডটি তেল আবিবে একটি কনসার্টে অংশ নিয়েছিল, যা তখন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।

 

‘দ্য সানডে টাইমস ম্যাগাজিন’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে থম ইয়র্ক তার এই অবস্থান পরিবর্তনের কথা স্পষ্ট করে জানান। ইসরায়েলে আর অনুষ্ঠান করবেন কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি বলেন, “একেবারেই নয়। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সুদূর-ডানপন্থী সরকার থেকে ২০০০ কিলোমিটার (৫০০০ মাইল) দূরত্বের মধ্যেও আমি থাকতে চাই না।” ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টর-ডানপন্থী সরকারের প্রতি তার গভীর অনীহা এই মন্তব্যের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, এই মন্তব্যগুলো ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঠিক আগে করা হয়েছিল।

 

রেডিয়োহেড ব্যান্ডটি তাদের ২০১৬-১৮ সালের 'অ্যা মুন শেইপড পুল' বিশ্ব সফরের অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে তেল আবিবে পারফর্ম করেছিল। ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক বয়কট, বিনিয়োগ ও নিষেধাজ্ঞা (বিডিএস) আন্দোলনের পক্ষ থেকে কনসার্টটি বাতিলের জন্য জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছিল। এই আহ্বানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ব্যান্ডটি সেবার অনুষ্ঠানটি করেছিল, যা রক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল।

 

ঐ সময়ে, ইয়র্ক এবং তার ব্যান্ড সদস্যরা দৃঢ়ভাবে যুক্তি দিয়েছিলেন যে শিল্প এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিভাজন বা নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত নয়। তাদের মতে, গান গাওয়া কোনো রাজনৈতিক সরকারের নীতির প্রতি সমর্থন নয়, বরং তা মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম। তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

 

সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে থম ইয়র্ক তার অতীতের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে এক ধরনের আক্ষেপের সুরও প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, যখন ইসরায়েলের “স্পষ্টতই প্রভাবশালী কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি” তাদের হোটেলে এসে কনসার্ট করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান, তখন তিনি “ভীত ও স্তম্ভিত” হয়ে গিয়েছিলেন। তার এই অনুভুতি থেকেই বোঝা যায়, বিতর্কিত ওই কনসার্টটি আয়োজনে তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও পেশাদারিত্বের মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাত তৈরি হয়েছিল। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেন যে, কনসার্টটি সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সহায়ক হয়েছিল, যা তার কাম্য ছিল না।

 

একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হিসেবে, থম ইয়র্কের এই সিদ্ধান্তটি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সঙ্গীত এবং রাজনীতি-এই দুই ক্ষেত্রের সংঘাত বহু পুরোনো, কিন্তু ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে শিল্পীদের ব্যক্তিগত অবস্থান প্রায়শই কঠোরভাবে পরীক্ষিত হয়।

 

থম ইয়র্কের বর্তমান অবস্থান শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সেই সংবেদনশীলতারই প্রতিচ্ছবি, যেখানে তারা কোনো সরকারের বিতর্কিত নীতির সময়ে নিজেদের মঞ্চকে ব্যবহার করে সেই নীতির বৈধতা দিতে চান না। তার মন্তব্যে পেশাদারিত্বের ছাপ যেমন স্পষ্ট, তেমনি মানবিক সংবেদনশীলতাও নিহিত। বিশেষত, নেতানিয়াহু সরকারের রাজনৈতিক প্রবণতা এবং গাজাসহ ফিলিস্তিনি অঞ্চলে তাদের নীতির তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনার প্রেক্ষাপটে ইয়র্কের এই বক্তব্য বিশ্বজুড়ে বহু শিল্পী ও কর্মীর মনোভাবে একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

 

এই ঘটনা আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন তুলেছে যে, রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শিল্পীরা কি কেবলই সঙ্গীত পরিবেশন করেন, নাকি তাদের উপস্থিতি প্রকারান্তরে একটি রাজনৈতিক বিবৃতি হয়ে দাঁড়ায়? রেডিয়োহেডের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যান্ডের প্রধান শিল্পীর এই ধরনের অবস্থান পরিবর্তন নিশ্চিতভাবেই বিশ্বের অন্যান্য শিল্পীদের ওপরও প্রভাব ফেলবে, যারা অনুরূপ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পারফর্ম করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, কারণ এটি কেবলমাত্র একটি কনসার্ট বাতিল নয়, বরং বহু বছর ধরে চলে আসা এক বিতর্কের নতুন মোড়।

 

- Al Jazeera News