এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের অভ্যন্তরেই এক তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্টের (নেসেট) একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য এই সিদ্ধান্তকে "চরম আপত্তিকর" বলে নিন্দা করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে, এই ধরনের পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে ইহুদি প্রবাসীদের (ডায়াস্পোরা) সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ককে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই ঘটনাটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল, এমনকি খোদ ইহুদি কর্মীদের প্রতিও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতার এক নতুন ও উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত। যে কর্মীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর উগ্রপন্থী ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দিতে সেখানে গিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে পশ্চিম তীরে বার্ষিক জলপাই আহরণের মৌসুম শুরু হয়েছে, যা ফিলিস্তিনি অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একটি আমার জীবন অংশ। কিন্তু প্রতি বছরের মতো, এই মৌসুমটি ফিলিস্তিনি কৃষক এবং পার্শ্ববর্তী অবৈধ ইহুদি বসতির উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও সংঘাতের একটি ফ্ল্যাশপয়েন্ট হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে, এই সময়ে উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীরা প্রায়শই ফিলিস্তিনি কৃষক, তাদের সম্পত্তি এবং জলপাই গাছের ওপর সমন্বিত হামলা চালায়। গাছ কেটে ফেলা, ফসল চুরি করা, কৃষকদের মারধর করা এবং তাদের জমিতে প্রবেশে বাধা দেওয়াই এই সহিংসতার মূল লক্ষ্য। সমালোচকদের মতে, এই সহিংসতার উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব জমি থেকে বিতাড়িত করা এবং সেই জমিগুলোর ওপর বসতি স্থাপনকারীদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
এই সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে "র্যাবাইস ফর হিউম্যান রাইটস" (Rabbis for Human Rights - RHR) এর মতো ইসরায়েলি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো "সুরক্ষামূলক উপস্থিতি" (protective presence) নামক এক ধরনের কর্মসূচি পরিচালনা করে। এই কর্মসূচির আওতায়, ইসরায়েলি এবং আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকরা, বিশেষ করে ইহুদি কর্মীরা, ফিলিস্তিনি কৃষকদের সাথে জলপাই আহরণে অংশ নেন। তাদের এই উপস্থিতির মূল উদ্দেশ্য হলো, আন্তর্জাতিক ইহুদি কর্মীদের উপস্থিতি দেখে উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীরা হয়তো হামলা থেকে বিরত থাকবে এবং কোনো হামলা হলেও তা নথিভুক্ত করা সহজ হবে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই দুই মার্কিন ইহুদি নারী-যাদের একজন ১৮ বছর বয়সী তরুণী এবং অন্যজন পঞ্চাশোর্ধ্ব-"র্যাবাইস ফর হিউম্যান রাইটস"-এর এই কর্মসূচিতে অংশ নিতেই পশ্চিম তীরের নাবলুস গভর্নরেটের বুরিন গ্রামে গিয়েছিলেন। বুরিন গ্রামটি উগ্রপন্থী বসতি 'ইৎজহার' (Yitzhar)-এর খুব কাছে অবস্থিত, যা প্রায়শই ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গত ১৬ই অক্টোবর বুরিন গ্রামের আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষি জমিকে "বন্ধ সামরিক অঞ্চল" (Closed Military Zone) হিসেবে ঘোষণা করে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো প্রায়শই আইডিএফ-এর এই ধরনের ঘোষণার সমালোচনা করে বলেছে, এটি ফিলিস্তিনি কৃষকদের তাদের নিজস্ব জমি থেকে দূরে রাখার একটি কৌশল মাত্র, যা প্রায়শই বসতি স্থাপনকারীদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার, এই দুই মার্কিন নারী সেই সামরিক আদেশ লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনি কৃষকদের সাথে জলপাই তুলতে যান। ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে তাদের আটক করে। তাদের রামলে শহরের গিভন কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
কারাগারের ডিটেনশন রিভিউ ট্রাইব্যুনালে অনুষ্ঠিত এক সংক্ষিপ্ত শুনানিতে, বিচারক উল্লেখ করেন যে, ওই দুই নারী "একটি সামরিক আদেশ লঙ্ঘন করেছেন" এবং "নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশ মান্য করেননি"। এই অভিযোগের ভিত্তিতে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় না গিয়ে, দ্রুত প্রশাসনিক নির্বাসন এবং ১০ বছরের কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। শুক্রবার তাদের ইসরায়েল থেকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
এই নির্বাসন ও নিষেধাজ্ঞার খবর প্রকাশের পরপরই ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে কঠোর নিন্দাটি এসেছে নেসেটের 'ডায়াস্পোরা অ্যাফেয়ার্স কমিটি'র (প্রবাসী ইহুদি বিষয়ক কমিটি) চেয়ারম্যান, বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টির সদস্য (এমকে) গিলাদ কারিভের কাছ থেকে।
কারিভ এই সিদ্ধান্তকে "চরম আপত্তিকর" (outrageous) বলে অভিহিত করেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, এই বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি তার কমিটিতে একটি জরুরি শুনানি আহ্বান করবেন এবং এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের তলব করবেন।
গিলাদ কারিভ, যিনি নিজে একজন সংস্কারবাদী ইহুদি ধর্মগুরু (র্যাবাই), তিনি এই সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, "এই অন্যায়ের বাইরেও, এই পদক্ষেপটি প্রবাসী ইহুদিদের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ককে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং এটি উদারনৈতিক-জায়নবাদী বিশ্বদর্শনের বৈধতাকেই ক্ষুণ্ণ করছে।"
কারিভের এই বক্তব্যের গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। ইসরায়েল নিজেকে বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের একমাত্র রাষ্ট্র ও আশ্রয়স্থল হিসেবে দাবি করে। কিন্তু এই ঘটনায়, দুজন ইহুদি নারী, যারা মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে এসেছিলেন, তাদেরকেই রাষ্ট্রীয় শত্রু হিসেবে গণ্য করা হলো। সমালোচকরা বলছেন, এটি বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ ও উদারপন্থী ইহুদিদের কাছে একটি ভয়াবহ বার্তা পাঠিয়েছে। এই উদারপন্থী ইহুদিরা জায়নবাদকে সমর্থন করলেও, তারা ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়েও সোচ্চার। ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ কার্যত তাদের এই বার্তাই দিচ্ছে যে, "উদারনৈতিক জায়নবাদ"-এর (Liberal Zionism) কোনো স্থান আজকের ইসরায়েলে নেই।
একই সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে "র্যাবাইস ফর হিউম্যান রাইটস" (RHR) সংগঠনটিও। সংস্থাটির পরিচালক, আভি দাবুশ, ইসরায়েলি সরকারের এই সিদ্ধান্তকে এক অভাবনীয় ভাষায় আক্রমণ করেছেন। দাবুশ বলেন, "ইহুদিদের ইসরায়েলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া একটি জায়নবাদ-বিরোধী এবং ইহুদি-বিরোধী কাজ।" তিনি এই অভিযোগের মাধ্যমে ইসরায়েলি রাষ্ট্রের মূল আদর্শকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তার সংগঠনের সমস্ত কার্যক্রম "অহিংস" এবং "আইন মেনে" পরিচালিত হয়।
এই ঘটনাকে "সম্পূর্ণ উন্মাদনা" (really crazy) হিসেবে আখ্যায়িত করে আভি দাবুশ বলেন, "দুজন ইহুদি নারী জায়নবাদী মূল্যবোধ নিয়ে এবং জায়নবাদী উদ্দেশ্যেই ইসরায়েলে এসেছিলেন, দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে। আর তার এই পরিণতি হলো!"
দাবুশ তার ক্ষোভের চূড়ান্ত পর্যায়ে ইসরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দ্বিচারিতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, পুলিশ সেইসব ইহুদি সন্ত্রাসীদের (উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারী) থামায় না, যারা আমাদের এবং ফিলিস্তিনি জলপাই চাষীদের বিরুদ্ধে কাজ করছে।"
তার এই অভিযোগটি পশ্চিম তীরের বাস্তবতার এক কঠিন চিত্র তুলে ধরে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়শই বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় হয় বাধা দেয় না, অথবা ক্ষেত্রবিশেষে তাদের পরোক্ষভাবে মদদ জোগায়। কিন্তু ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেল এবার, যখন দুজন অহিংস ইহুদি কর্মীকে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর "অপরাধে" এত দ্রুত ও কঠোর শাস্তি পেতে হলো।
এই ঘটনাটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ আদর্শগত সংঘাতকে আরও একবার প্রকাশ্যে নিয়ে এলো-যেখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ন্যার্যাটিভা, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং মানবাধিকারের মৌলিক নীতিগুলোর মধ্যেকার দ্বন্দ্ব ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে।