দলটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ে সরকারের সঙ্গে তারা আর কোনো ধরনের আলোচনায় বা সমঝোতায় অংশ নেবে না।
দেশজুড়ে চলমান তীব্র ছাত্র আন্দোলন এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ন্যক্কারজনক ঘটনাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দলটির এমন অনড় অবস্থান ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং শিক্ষাঙ্গনে এক নতুন ও জটিল মাত্রা যোগ করেছে।
শনিবার প্রখ্যাত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিতে প্রকাশিত একটি বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদনের বরাতে এই ছাত্র আন্দোলন এবং দলটির কঠোর অবস্থানের কথা সর্বসম্মুখে আসে। ককরোচ জনতা পার্টির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পোস্টে নিজেদের দলের অবস্থান জাতির সামনে পরিষ্কার করেছেন।
তিনি তার বার্তায় দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তাদের কাছে সম্পূর্ণ অলঙ্ঘনীয় এবং আপসহীন একটি বিষয়। তিনি আরও যুক্ত করেন, সরকার যদি শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক ও নৈতিক দাবিতে বিন্দুমাত্র সম্মত না হয়, তবে আগামীতে তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী কোনো আলোচনার আর কোনো ন্যূনতম অর্থই বহন করে না।
মূলত তাদের বর্তমান এই তীব্র আন্দোলন তিনটি প্রধান ও সুনির্দিষ্ট দাবির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমত, অবিলম্বে শিক্ষামন্ত্রীর নিঃশর্ত পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশব্যাপী যে সকল শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ এই যৌক্তিক আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না।
তৃতীয়ত, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো চরম হতাশাজনক ঘটনার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে যেসব নিরীহ ও মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নিয়েছেন, তাদের প্রতিটি পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক কোটি রুপি করে প্রদান করতে হবে। এই তিন দফা দাবির বিষয়ে তারা একচুলও ছাড় দিতে নারাজ বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক কনস্টিটিউশন ক্লাবে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সিজেপি নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সরকারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিং।
ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এক দীর্ঘ ও রুদ্ধদ্বার দ্বিতীয় দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত সংবেদনশীল ও শ্বাসরুদ্ধকর এই বৈঠকে উভয় পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হলেও চূড়ান্ত কোনো ঐক্যমত্য বা সমাধান আসেনি।
সেই বৈঠকে সরকার পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের আইনি সুরক্ষা প্রদান এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের মতো নীতিগত দাবিগুলোতে ইতিবাচক সম্মতি জ্ঞাপন করা হয়। তবে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মতো সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও প্রধান দাবির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত বা আশ্বাস প্রদান করা হয়নি।
বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছিলেন যে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের হওয়ায় সরকারের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ভেতরে বিস্তর আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সেই অভ্যন্তরীণ আলোচনার পর শনিবার বিকেলে তারা পুনরায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তৃতীয় দফার চূড়ান্ত বৈঠকে বসবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, সরকারি উচ্চপদস্থ সূত্রের বরাতে জানা গেছে যে, দেশব্যাপী এত তীব্র আন্দোলন ও নানামুখী রাজনৈতিক চাপের মুখেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তাদের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর পাশেই দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে। অন্তত এই মুহূর্তে তার পদত্যাগের কোনো ধরনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
তবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র ক্ষোভ ও সামগ্রিক পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিতর্কিত পরীক্ষা পরিচালনা সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-এর প্রায় ৪৭ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
একইসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও তার পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে যেন লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই ধরনের ভয়াবহ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য দ্রুত বিচার বা ফাস্ট ট্র্যাক আদালত গঠন এবং সর্বোচ্চ ও কঠোর শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইন প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দিয়েছে সরকার।
এতসব প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও আইনি উদ্যোগ সত্ত্বেও আন্দোলনকারী দলটির মূল দাবি আদায়ে অনড় অবস্থান পুরো পরিস্থিতিকে একটি মারাত্মক জটিল রূপ দিয়েছে। সিজেপি মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ও জোরালো যুক্তিতে জানিয়ে দিয়েছেন যে, একটি মন্ত্রণালয়ের যেকোনো নজিরবিহীন ব্যর্থতার চূড়ান্ত জবাবদিহিতা স্বভাবতই সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর ওপরই বর্তায়।
তাই, নিট পরীক্ষার মতো এত বড় একটি জাতীয় কেলেঙ্কারির পর শুধুমাত্র কয়েকজন অধস্তন কর্মকর্তাকে ছাঁটাই করা বা বদলি করাই কোনোভাবেই যথেষ্ট হতে পারে না, এটি কেবল মূল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানোর একটি অপচেষ্টা মাত্র। মন্ত্রীর পদত্যাগের মাধ্যমেই কেবল এই বিশাল অনিয়মের প্রকৃত দায়ভার গ্রহণ করা সম্ভব।
উভয় পক্ষের এই অনমনীয় অবস্থানের কারণে শনিবার বিকেলের নির্ধারিত তৃতীয় দফার বৈঠকটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না বা অনুষ্ঠিত হলেও সেখান থেকে কোনো ইতিবাচক, অর্থবহ ও কার্যকরী সমাধান বেরিয়ে আসবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ নাগরিক, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। গোটা দেশের মানুষ এখন অত্যন্ত উৎকণ্ঠার সঙ্গে এই সংকটময় পরিস্থিতির পরবর্তী পরিণতির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন।