শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ভারতের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০১:০৫ পিএম

বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ভারতের
ছবি : Collected

 

বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা স্তব্ধতা নেমে এসেছিল।

 

দীর্ঘদিনের প্রথাগত সমীকরণে যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পরিবর্তনের মুখ দেখতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন-সংক্রান্ত আলোচনার আবহ তৈরি হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংযোগ পুনরায় জোরদার করার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।

 

এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ও বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আগের মতোই ইতিবাচক ধারায় সামনে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে ভারত। প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সার্বিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার স্বার্থে তারা ঢাকার সাথে কূটনৈতিক আলোচনা ও সমন্বয় অব্যাহত রাখতে সম্পূর্ণ সচেষ্ট।

 

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা প্রদান করা হয়। ব্রিফিং চলাকালে উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল।

 

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি, নতুন প্রশাসন ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন উত্থাপন করেন। জবাবে মুখপাত্র জয়সওয়াল স্পষ্ট করেন যে, দিল্লির মূল লক্ষ্য হলো দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার বহুদিনের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ককে আরও সমৃদ্ধ ও সুদৃঢ় করা।

 

এ বিষয়ে ভারতের আগ্রহ এবং গঠনমূলক মনোভাবের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি দুই দেশের চলমান সংযোগ বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর প্রদান করেন। সংবাদ ব্রিফিংয়ে একপর্যায়ে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেস কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রসঙ্গটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

 

উপস্থিত এক সংবাদকর্মী প্রশ্ন তোলেন যে, বাংলাদেশ সরকার ভারতে নতুন করে দুইজন প্রেস কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে পাঠিয়েছে, যাঁদের অতীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতবিদ্বেষী বা সমালোচনামূলক নানা মন্তব্য ও অবস্থান নিতে দেখা গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান কী-তা জানতে চাওয়া হয়।

 

এর জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল অত্যন্ত পেশাদার ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রদর্শন করেন। তিনি জানান যে, নতুন এসব কূটনৈতিক ও সংবাদ কর্মকর্তাদের নিয়োগের বিষয়টি ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।

 

কোনো ব্যক্তিগত বা অতীত বিতর্ককে প্রাধান্য না দিয়ে ভারত মূলত দ্বিপক্ষীয় সুসম্পর্ক বজায় রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক উপায়ে সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং নয়াদিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য তারা সর্বদা প্রস্তুত ও উন্মুখ হয়ে আছে।

 

উক্ত সংবাদ ব্রিফিংয়ে অন্যান্য আঞ্চলিক ইস্যুতেও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে একাধিক প্রশ্ন তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে প্রবীণ সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী একটি গুরুত্ববহ প্রশ্ন উত্থাপন করে জানতে চান যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত খুব শিগগিরই বাংলাদেশ সফরে যেতে পারেন বলে আলোচনা চলছে।

 

এই পরিকল্পিত ঢাকা সফর বা সফরসূচি সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়েছে কিনা এবং উক্ত সফরের মূল উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ভারত সরকার অবগত রয়েছে কিনা।

 

এর জবাবে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল অতি সংক্ষিপ্ত কিন্তু স্পষ্ট বাক্যে জানান যে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সম্ভাব্য এই ঢাকা সফর সম্পর্কিত কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট বা আনুষ্ঠানিক তথ্য এই মুহূর্তে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে নেই। ফলে এ বিষয়ে কোনো বাড়তি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে ভারতীয় পররাষ্ট্র দফতর।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কে যে সাময়িক বরফ জমাট বেঁধেছিল, তা গলতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।

 

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই ইতিবাচক বক্তব্য দুই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংযোগকে আবারও সুসংহত করার ইঙ্গিত দেয়। প্রথাগত মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব দূর করে পেশাদার ও কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে সম্পর্ক পুনর্গঠনই এখন উভয় দেশের মূল অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ভবিষ্যতে আলোচনার টেবিল ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে উভয় পক্ষ কীভাবে এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে একটি নতুন ও গতিশীল মাত্রায় রূপদান করে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।