শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষামন্ত্রীকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি গ্রহণযোগ্য হবে না, রাহুল গান্ধীর

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০১:৪৪ পিএম

শিক্ষামন্ত্রীকে অন্য মন্ত্রণালয়ে বদলি গ্রহণযোগ্য হবে না, রাহুল গান্ধীর
ছবি : Collected

ভারতের রাজনীতি ও শিক্ষাঙ্গনে চলমান তীব্র অস্থিরতার মাঝে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা ও প্রবীণ রাজনীতিক রাহুল গান্ধী।

 

দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারি এবং এর প্রতিবাদে রাজপথে নামা শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে কেবল অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়া হলে তা কোনোভাবেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

 

শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমনে এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে সম্পূর্ণভাবে অপসারণ বা বরখাস্ত করার একদফা দাবিতে তিনি অনড় অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কাড়া এই রাজনৈতিক উত্তাপ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যখন দেশজুড়ে প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বিরোধী দলের এই কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রার যোগ করেছে।

 

শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক বিশেষ ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধী এই মন্তব্য করেন। এ সময় তার পাশে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) তিনজন শীর্ষস্থানীয় শিক্ষার্থী প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

 

তাদের উপস্থিতিতে রাহুল গান্ধী অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জোরালো ভাষায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তিন দফা যৌক্তিক দাবির কথা দেশবাসীর সামনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী তার দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন এবং চলমান শিক্ষা সংকট নিরসনে তার কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই।

 

সরকারের অভ্যন্তরীণ মহলের বরাত দিয়ে রাহুল গান্ধী উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে পদায়নের একটি প্রচ্ছন্ন আলোচনা সরকারের ভেতরে চলছে।

 

কিন্তু এই ধরনের লোক দেখানো প্রশাসনিক রদবদল সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলগুলোর কাছে বিন্দুমাত্র গ্রহণযোগ্য হবে না বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন। শিক্ষামন্ত্রীকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত, অযোগ্য এবং দায়িত্ব পালনে চরম ব্যর্থ’ আখ্যা দিয়ে তিনি অবিলম্বে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার জোর দাবি জানান।

 

তিনি মনে করেন, শিক্ষামন্ত্রীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে যিনি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন, তাকে সরকারের অন্য কোনো দায়িত্ব প্রদান করা মানে মূলত দুর্নীতি ও অযোগ্যতাকেই পুরস্কৃত করার শামিল।

 

শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ওপর পুলিশি হামলার তীব্র সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় এই নেতা প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়টিও জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত ২০ জুলাই নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা যখন ভারতের সংসদ ভবন অভিমুখে এক অহিংস বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল, তখন তাদের ওপর বর্বরোচিত পুলিশি হামলা চালানো হয়।

 

সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জসহ যে অমানবিক দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে, তাকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন রাহুল গান্ধী। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি জানান, নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর এমন নিষ্ঠুর নির্যাতনের সাথে যে সকল পুলিশ কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সরাসরি জড়িত ছিলেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

 

গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার যে সাংবিধানিক অধিকার নাগরিকদের রয়েছে, তা খর্ব করার এই অপচেষ্টাকে কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে রাহুল গান্ধীর সমালোচনার তীর সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দিকেও ধাবিত হয়। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা ও সরকারের উদাসীনতার সমালোচনা করেন।

 

শিক্ষার্থীদের প্রতি বর্তমান সরকারের ন্যূনতম জবাবদিহির অভাব এবং তাদের ওপর সংঘটিত পুলিশি নির্যাতনের সম্পূর্ণ দায়ভার প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপিয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, দেশের শীর্ষ নির্বাহী হিসেবে নরেন্দ্র মোদিকে অবশ্যই এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিন্দনীয় ঘটনার জন্য জনসমক্ষে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।

 

তার মতে, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন অবমাননাকর আচরণের দায় এড়াতে পারেন না। শিক্ষার্থীদের আবেগ ও ভবিষ্যতের প্রতি সরকারের এই চরম উদাসীনতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির পরিপন্থি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

পরিশেষে, চলমান এই অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানান লোকসভার এই প্রভাবশালী বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি সরকারের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, সরকার এখনো শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ও মৌলিক দাবিগুলোর প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করছে না।

 

শিক্ষার্থীরা এখন আর সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ফাঁকা প্রতিশ্রুতি বা সান্ত্বনামূলক পরামর্শ শুনতে মোটেও আগ্রহী নয়; তাদের একমাত্র ও চূড়ান্ত দাবি হলো ব্যর্থ শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত অপসারণ।

 

শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও যৌক্তিক দাবির প্রতি নিজের এবং তার দলের পূর্ণাঙ্গ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে রাহুল গান্ধী অবিলম্বে এই সংকটের একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধানের তাগিদ দিয়েছেন, যেন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর কোনোভাবেই শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন ভয়াবহ অনিশ্চয়তা ও রাষ্ট্রীয় বঞ্চনার শিকার না হয়।

 

প্রখ্যাত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-এর একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, বিরোধী দল ও শিক্ষার্থীদের এই সম্মিলিত চাপ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে আগামী দিনে আরও কঠিন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষার সম্মুখীন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

- দ্য হিন্দু