সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু থেকেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অনড় অবস্থান এবং আপসহীন মনোভাবের কারণে আজ শনিবার তিনি তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।
এই ঘটনা ভারতের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগের খবরের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজপথে উল্লাসে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
এই ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষাপটে আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদানকারী সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অন্যতম শীর্ষ নেতা অভিজিত দীপকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ হিন্দি প্রবাদের উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় সরকারের অহমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন প্রশাসনকে সরাসরি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “সর্বত্র বলা হতো যে বর্তমান এই সরকারে পদত্যাগের কোনো নিয়ম বা রেওয়াজ নেই। কিন্তু আজ প্রমাণিত হলো, দুনিয়া ঠিকই মাথা নত করে, শুধু মাথা নত করানোর জন্য সঠিক লোক থাকা চাই।”
তাঁর এই সুচিন্তিত ও গভীর অর্থবহ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূলত রাজপথে আন্দোলনরত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর অসীম ধৈর্য, গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের স্পৃহা এবং কোনো ধরনের অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার দৃঢ় সংকল্পের বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বৃহৎ ও অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক প্রবেশিকা পরীক্ষা হলো ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা সংক্ষেপে নিট। এই চিকিৎসা বিজ্ঞান বা মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ-তরুণী দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন।
কিন্তু সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি গোটা ভারতের শিক্ষাঙ্গনে এক বিশাল কালো ছায়ার জন্ম দেয়। নিজেদের মেধা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন ভয়াবহ ছিনিমিনি খেলার কারণে ক্ষোভে ফেটে পড়েন দেশটির লাখো তরুণ।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক দায়ভার গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত পদত্যাগের একদফা দাবিতে তাঁরা রাজপথে নেমে আসেন। শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও তীব্র ও বেগবান হতে থাকে।
বিশেষ করে গত সোমবার নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যখন দিল্লির যন্তর মন্তরের মতো ঐতিহাসিক অবস্থানস্থল থেকে ভারতের পার্লামেন্ট ভবনের দিকে একটি বিশাল প্রতিবাদী পদযাত্রা বা মার্চ শুরু করেন, তখন তাঁদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফ থেকে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়।
নিরস্ত্র ও নিরীহ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে লাঠিচার্জ ও মারধরের ঘটনা সমগ্র ভারতজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তোলে। পুলিশি নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের এই অপচেষ্টা হিতে বিপরীত হয় এবং এর পর থেকে বিক্ষোভের আগুন গোটা দেশে আরও প্রবল আকার ধারণ করে।
শিক্ষার্থীদের দমাতে সরকারের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপই কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই প্রধান তিনটি সুনির্দিষ্ট ও অলঙ্ঘনীয় শর্ত বা দাবির কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সরকারের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
তাঁদের সর্বপ্রধান দাবি ছিল চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ভার কাঁধে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আর্থিকভাবে ও মানসিকভাবে যে সকল মেধাবী পরীক্ষার্থী চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক কোটি রুপি করে প্রদান করতে হবে।
এবং তৃতীয়ত, ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজপথে নামা এবং বিক্ষোভে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধেই কোনো ধরনের শাস্তিমূলক বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। ভারতের সুপরিচিত ও শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনের সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের এই ইস্পাতকঠিন ঐক্যের কাছে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
শিক্ষামন্ত্রীর এই পদত্যাগ কেবল একটি রদবদল নয়, বরং এটি প্রমাণ করেছে যে, সংগঠিত জনমত এবং ন্যায্য দাবির মুখে যেকোনো ক্ষমতাশালী প্রশাসনকেই জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব।