পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, গ্রেপ্তারের পর যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যে তাকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পুনে বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়েছে। সেখান থেকে তাকে মহারাষ্ট্রের ভিওয়ান্ডিতে স্থানান্তর করা হবে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন থেকে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খবরটি জানা যায়। পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত বিজেন্দ্র কুমার গুপ্ত দীর্ঘ সময় ধরে নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পূর্ণভাবে গোপন রেখেছিলেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে একটি ভুয়া নাম ও পরিচয়ে বিহারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আত্মগোপন করে বসবাস করছিলেন।
পেশায় একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারের সাবেক শিক্ষক বিজেন্দ্র কুমার গুপ্তের বিরুদ্ধে এর আগেও শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলা রয়েছে। পুলিশি তদন্ত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগোলেও এই মূল পরিকল্পনাকারী দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।
এই বিশাল প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেলেঙ্কারির কারণে রাজ্য সরকার এখনো পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার নতুন কোনো সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করতে পারেনি। ফলে মেধা ও শ্রম দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং কর্মজীবন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও হতাশাজনক পরিস্থিতিতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সম্পূর্ণ দায়ভার গ্রহণ করে মহারাষ্ট্রের স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দাদা ভুসের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্র সংগঠনগুলো রাজপথে নেমে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে।
শিক্ষার্থীদের এই চলমান ও ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মাঝেই মূল অভিযুক্তের গ্রেপ্তারের খবরটি জনসমক্ষে এল, যা তদন্ত প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগে, চলতি বছরের ৫ জুলাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই বিশাল জালিয়াতির গভীর তদন্তের জন্য গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল উত্তর প্রদেশের আগ্রাভিত্তিক একটি স্বনামধন্য ছাপাখানা থেকে তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছিল।
তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল যে, পরীক্ষার অত্যন্ত গোপনীয় প্রশ্নপত্র ছাপানোর দায়িত্ব পালনের সময়ই তারা অর্থের লোভে তা ফাঁস করে দিয়েছিলেন। ওই তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এই জালিয়াতির মামলায় মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল দশ জনে, তবে চক্রের মূল হোতা ও পরিকল্পনাকারী বিজেন্দ্র গুপ্ত তখনো পলাতক ছিলেন।
আগ্রার সেই ছাপাখানা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ওই তিন ব্যক্তি হলেন নরেশকুমার পুরানচাঁদ মাহোর, সঞ্জয়কুমার সুরেশচন্দ্র চন্দ্র এবং বাবুলাল নারায়ণসিং কুশওয়াহা। তাদের ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে কড়া পাহারায় ভিওয়ান্ডি আদালতে হাজির করা হলে, পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত তাদেরকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মূল অভিযুক্তের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের জোন ২-এর ডেপুটি কমিশনার পবন বানসদ উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের বিস্তারিত জানান। তিনি বলেন, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ সহায়তায় পুলিশ বিজেন্দ্রর গোপন অবস্থান অত্যন্ত সফলভাবে শনাক্ত করে এবং শনিবার সকালে তাকে বিহার থেকে গ্রেপ্তার করে।
তাকে দ্রুত সময়ের মধ্যে থানেতে নিয়ে এসে রিমান্ড বা হেফাজতে নেওয়ার জন্য উপযুক্ত আদালতে হাজির করা হবে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র বিপুল অর্থের বিনিময়ে কেনার জন্য যারা পূর্বেই চুক্তি করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে ঘটনা জানাজানি হওয়ায় আত্মগোপনে চলে গেছেন, তাদেরও নিবিড়ভাবে খোঁজা হচ্ছে।
যারা ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা বর্তমানে বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন এবং খুব শিগগিরই এই চাঞ্চল্যকর মামলার একটি পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগপত্র আদালতের কাঠগড়ায় জমা দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বহু প্রতীক্ষিত এই পরীক্ষার মাত্র দুই দিন আগে থানে সিটি পুলিশ ভিওয়ান্ডির এক স্থানীয় বাসিন্দার কাছ থেকে পাওয়া অত্যন্ত গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারে যে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাধারণ পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নপত্র বিক্রির জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
এরপর পুলিশি অভিযানে বিহার ও হরিয়ানা থেকে যথাক্রমে রাজীব কুমার, আকাশ কুমার এবং ধীরজ সিংকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুরো ঘটনার শিকড় অনুসন্ধানে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়।
তদন্তে আরও বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে আসে যে, সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রাখার স্বার্থে রাজ্য সরকার দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে মহারাষ্ট্রের বাইরের একটি ছাপাখানায় প্রশ্নপত্র ছাপানোর কাজ করে আসছিল। আগ্রার ‘মহিম পত্রন প্রাইভেট লিমিটেড’ নামক ওই ছাপাখানার পরিচয় কেবল পরীক্ষা পরিষদের প্রধান কর্মকর্তারাই জানতেন।
কিন্তু ওই ছাপাখানারই দুই বর্তমান ও এক সাবেক কর্মী নিজেদের জুতার তলার অংশে অত্যন্ত সুকৌশলে প্রশ্নপত্রের কপি লুকিয়ে তা ছাপাখানার বাইরে পাচার করতেন। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, চক্রের মূল হোতা বিজেন্দ্র গুপ্ত মাত্র আট হাজার টাকার সামান্য প্রলোভন দেখিয়ে ওই তিন কর্মীকে এই বেআইনি ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে ব্যবহার করেছিলেন।
এই ঘটনার পাশাপাশি তদন্তকারী দল গ্রেপ্তার হওয়া এক অভিযুক্তের কাছ থেকে তিনটি তাজা গুলি বা কার্তুজ উদ্ধার করেছে, যা পুলিশ প্রশাসনকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। ভিওয়ান্ডির সহকারী পুলিশ কমিশনার বিজয় মারাঠে জানিয়েছেন, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি উদ্ধারের পর এই প্রশ্নফাঁসের তদন্ত আরও অনেক বেশি সংবেদনশীল ও রহস্যময় হয়ে উঠেছে।
এগুলো কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং কী ভয়ংকর উদ্দেশ্যে নিজেদের কাছে রাখা হয়েছিল, তা পুলিশ নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে। ২০২১ সালেও এমন ফাঁসের ঘটনার পর রাজ্যের বাইরের ছাপাখানার ওপর ভরসা করেছিল শিক্ষা পরিষদ।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই তথাকথিত সুরক্ষাব্যবস্থাও চরম ব্যর্থ ও ভঙ্গুর প্রমাণিত হওয়ায় স্কুল শিক্ষা বিভাগ এখন পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তার জন্য সম্পূর্ণ নতুন, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত ও বিকল্প কোনো সুরক্ষাব্যবস্থার কথা গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে।