শনিবার শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণার পরপরই সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের তিন দফা দাবির মাত্র একটি পূরণ হয়েছে। বাকি দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দাবি অবিলম্বে মেনে নেওয়া না হলে এই অহিংস ছাত্র আন্দোলন কোনোভাবেই থামবে না বলে সরকারের প্রতি কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা বা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় এক নজিরবিহীন সংকটের জন্ম দিয়েছে। মেধাভিত্তিক এই পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় দেশজুড়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
এই ভয়াবহ নৈরাজ্যের সম্পূর্ণ দায়ভার কাঁধে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছিল আন্দোলনকারীদের সর্বপ্রধান শর্ত। সরকার শেষ পর্যন্ত সেই বিপুল জনরোষ ও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।
তবে সিজেপি মনে করে, কেবল একজন মন্ত্রীর অপসারণই চলমান এই গভীর ক্ষতের একমাত্র নিরাময় হতে পারে না। তাদের মতে, কাঠামোগত সংস্কার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি রাষ্ট্রের যথাযথ দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
ভারতের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রবেশের অন্যতম কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম হলো নিট পরীক্ষা। বছরের পর বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অনৈতিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকাণ্ড তাদের সেই নিরলস সাধনাকে চরমভাবে অপমানিত করেছে। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে হাজার হাজার শিক্ষার্থী একতাবদ্ধ হয়েছেন।
দিল্লির যন্তর মন্তর, যা ভারতের যেকোনো গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দু, সেখানে টানা অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে তারা পুরো দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
এই নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন তৈরি হয়েছে, যা ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর পর্বতপ্রমাণ চাপ সৃষ্টি করেছে। ককরোচ জনতা পার্টির উত্থাপিত বাকি দুটি দাবির মধ্যে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়টি হলো ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে যেসব মেধাবী পরীক্ষার্থী আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিয়েছেন, তাদের প্রতিটি শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এক কোটি রুপি করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই এই তরুণ প্রাণগুলো অকালে ঝরে গেছে, তাই রাষ্ট্রকেই এর সম্পূর্ণ দায়ভার বহন করতে হবে।
অন্যদিকে, তাদের তৃতীয় দাবিটি হলো পুলিশি নিপীড়নের বিচার। গত ২০ জুলাই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের ওপর যেসব পুলিশ সদস্য বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছিলেন, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
গত ২০ জুলাইয়ের ওই মর্মান্তিক ঘটনাটি এই ছাত্র আন্দোলনের একটি অন্যতম কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সেদিন নিজেদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া নিয়ে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে অগ্রসর হতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যাপক বলপ্রয়োগ করেন।
লাঠিচার্জ ও আটকের ঘটনায় অনেক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকের কথায় সেই পুলিশি নির্যাতনের ক্ষোভ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এটিই হলো প্রকৃত গণতন্ত্রের রূপ। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন ঠিকই, কিন্তু আমাদের আরও দুটি অত্যন্ত ন্যায্য দাবি এখনো রয়ে গেছে। আমরা এত সহজে রাজপথ ছেড়ে যাব না।"
ওই একই বার্তায় অভিজিৎ দীপকে নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করে আরও যুক্ত করেন, "ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু যেসব নিরীহ শিক্ষার্থী আত্মাহুতি দিয়েছে, তাদের পরিবারকে অবশ্যই এক কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
সরকারকে যেকোনো মূল্যে এই অর্থ প্রদান করতেই হবে। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, গত ২০ জুলাই পুলিশের যেসব সদস্য গুণ্ডাদের মতো আচরণ করে সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মমভাবে হামলা চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।"
সবশেষে তিনি প্রচ্ছন্ন একটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, "মনে রাখবেন, ককরোচদের সঙ্গে কোনোভাবেই সংঘাতে জড়াতে যাবেন না।" ভারতের অন্যতম শীর্ষ সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে কেন্দ্রীয় সরকারকে এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ একটি প্রাথমিক বিজয় হলেও, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে সরকারকে আরও অনেক দূর যেতে হবে।
ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং দোষী পুলিশ সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা হলে তা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এখন দেখার বিষয়, উদ্ভূত এই জটিল ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে শিক্ষার্থীদের বাকি দাবিগুলো মোকাবিলা করে এবং শিক্ষাঙ্গনে পুনরায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।