শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে তরুণদের অভূতপূর্ব ঐক্যের নজির ভারতে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০৫:০৩ পিএম

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঊর্ধ্বে গিয়ে তরুণদের অভূতপূর্ব ঐক্যের নজির ভারতে
ছবি: সংগৃহীত

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে সৃষ্ট তীব্র আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেছেন ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। দীর্ঘ দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে দেশের সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের টানা অবস্থান কর্মসূচির পর শনিবার তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে তাঁর আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সুসংগঠিত ছাত্র আন্দোলন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

 

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের এই ঐতিহাসিক ও নীতিগত বিজয় কেবল একটি প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা, বরং এটি ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সাধারণ নাগরিকদের সুসংগঠিত প্রতিবাদের এক অনন্য ও শক্তিশালী মাইলফলক হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

 

সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে দেশের ছাত্রসমাজ ও তরুণদের এই অভূতপূর্ব ঐক্যই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনের পদত্যাগের পথ সুগম করেছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা স্থগিত রেখে দেশে ফিরে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আন্দোলনকারীদের অদম্য সাহসিকতার প্রশংসা করে বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর এক কঠোর বার্তা প্রদান করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ধর্মের বৈষম্য ভুলে দেশের সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজ যখন নির্দিষ্ট ও যৌক্তিক নাগরিক ইস্যু নিয়ে রাজপথে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী শাসকের অবস্থানও নড়ে ওঠে।

 

ধর্মান্ধতা ও বিভাজনের রাজনীতি এড়িয়ে কেবল ন্যায়বিচারের দাবিতে সবাই এক হলে রাষ্ট্রীয় যে কোনো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব, যা সামগ্রিকভাবে দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্যই অত্যন্ত মঙ্গলজনক।

 

ভারতের অন্যতম কঠিন ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা পরীক্ষা হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির জন্য আয়োজিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট। এই পরীক্ষার মাধ্যমে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ-তরুণী চিকিৎসক হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে অগ্রসর হন।

 

কিন্তু সম্প্রতি এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা উন্মোচিত হলে দেশজুড়ে তরুণ সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নৈরাশ্যের সৃষ্টি হয়। মেধাভিত্তিক এই পরীক্ষার স্বচ্ছতা বিনষ্ট হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পড়ার টেবিল ছেড়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হন।

 

দুর্নীতি ও অনিয়মের চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক দায় স্বীকার করে শুরু থেকেই শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের নিঃশর্ত অপসারণের দাবিতে আন্দোলনকারীরা রাজপথে অনড় অবস্থান নেন। রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে অভিজিৎ দীপকে সরকারের অহমিকা ও আন্দোলনকারীদের অনমনীয় দৃঢ়তার প্রতি ইঙ্গিত করে বক্তব্য দেন।

 

তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমান এই মোদি সরকারের মেয়াদে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো উচ্চপদস্থ মন্ত্রীর পদত্যাগের কোনো রীতি বা ঐতিহ্য নেই বলে সর্বমহলে যে ধারণা প্রচলিত ছিল, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সুসংগঠিত ও অদম্য লড়াই সেই ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে ভুল প্রমাণিত করেছে।

 

ধৈর্য ও ন্যায়ের পক্ষে দীর্ঘদিনের অহিংস সংগ্রাম যে কোনো আন্তর্জাতিক মানের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের আসল শক্তিকে উন্মোচিত করে, শিক্ষামন্ত্রীর এই ইস্তফা সেই ঐতিহাসিক সত্যকেই নতুন করে পুনপ্রতিষ্ঠা করল।

 

ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ জনগণের বিভিন্ন সামাজিক বা প্রশাসনিক দাবি প্রায়শই ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত। কিন্তু চলমান এই প্রশ্নফাঁসবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেই সনাতন ধারায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

 

চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষার মতো একটি সংবেদনশীল ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণী বিষয়ে সমাজের সকল স্তরের তরুণদের একত্রিত হওয়া প্রমান করে যে, তরুণ প্রজন্ম এখন সংঘাতের চেয়ে নিজেদের মৌলিক অধিকার এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

 

বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও শিক্ষার্থীদের এই সুসংগঠিত আন্দোলন এবং বিভাজনমুক্ত ঐক্যের শক্তির গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সর্বপ্রধান শর্তটি পূরণ হলেও, রাজপথে নামা তরুণদের সম্পূর্ণ স্বস্তি এখনো মেলেনি।

 

প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর চরম হতাশায় যেসব পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নিপীড়নের বিচার নিশ্চিত করার মতো অবশিষ্ট দাবিগুলো এখনো ঝুলে রয়েছে।

 

আন্দোলনকারী নেতৃত্বের মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে স্থায়ী পরিবর্তন এবং প্রতিটি স্তরে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা না আসা পর্যন্ত তাদের এই সামাজিক ও বৈপ্লবিক পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে। সামগ্রিকভাবে, ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মীয় বিভাজন সরিয়ে তরুণদের এই জাতীয় ঐক্য আগামী দিনে নীতিভিত্তিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার রাজনীতি গঠনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

 

- টাইমস অব ইন্ডিয়া