চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা বা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ভয়াবহ কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে দীর্ঘ দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই নিয়মতান্ত্রিক ও অহিংস আন্দোলন আজ এক নতুন এবং উদ্বেগজনক মোড় নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা শিক্ষার্থীদের আনন্দ মিছিলে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পুলিশি হস্তক্ষেপের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রখ্যাত ভারতীয় গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রকাশিত একটি বিশদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভস্থলে এই অনভিপ্রেত উত্তেজনার সূত্রপাত হয় মূলত অজ্ঞাত স্থান থেকে পাথর নিক্ষেপের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
তবে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীরাই পুলিশের ওপর প্রথম পাথর ছুড়েছেন, নাকি কোনো বহিরাগত বা তৃতীয় পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই হামলার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে অস্থিতিশীল ও কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে, তা গণমাধ্যমের ওই প্রতিবেদনে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
পাথর নিক্ষেপের ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার কারণ দেখিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা বিক্ষুব্ধ ও উল্লাসরত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ব্যাপকভাবে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেন এবং নির্বিচারে লাঠিচার্জ শুরু করেন।
এর ফলে সেখানে চরম এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষার্থীদের আনন্দোৎসব মুহূর্তের মধ্যেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে এক বড় ধরনের পটপরিবর্তন ঘটে।
শনিবার দুপুর ১২টার কিছু সময় পূর্বে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পদত্যাগের কথা ঘোষণা করেন। বিশ্বস্ত সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, পদত্যাগপত্রে তিনি নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সম্পূর্ণ প্রশাসনিক, কাঠামোগত ও নৈতিক দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেওয়ার কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই নজিরবিহীন দুর্নীতির প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির বলিষ্ঠ নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, শিক্ষামন্ত্রীর এই নিঃশর্ত পদত্যাগ ছিল তাদের প্রথম এবং সর্বপ্রধান দাবি।
এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ঘোষণার পরপরই যন্তর মন্তরে অবস্থানরত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ও আনন্দ পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষামন্ত্রীর এই আকস্মিক পদত্যাগের পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ছিল অত্যন্ত ঘটনাবহুল, ধারাবাহিক ও নাটকীয়।
এর ঠিক এক দিন আগে, গতকাল শুক্রবার ককরোচ জনতা পার্টির একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে দীর্ঘ দুই ঘণ্টাব্যাপী এক রুদ্ধদ্বার ও ফলপ্রসূ বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিল।
ওই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বৈঠকে ছাত্রনেতারা স্পষ্ট ভাষায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের জন্য একটি কঠোর চরমপত্র বা চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে আসেন। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আজ শনিবার বিকেলে আবারও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডার সঙ্গে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু শনিবার সকালেই ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে এক কঠোর ও আপসহীন বিবৃতিতে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা আর কোনো ধরনের সরকারি বা আনুষ্ঠানিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন না।
তাদের এই অনড়, যৌক্তিক ও আপসহীন অবস্থানের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণাটি আসে। তবে যন্তর মন্তরের এই আকস্মিক সংঘাত, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও পুলিশি অভিযানের পরও সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যকার আলোচনার পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে যায়নি।
সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ তথ্য নিশ্চিত করেছে যে, ককরোচ জনতা পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং অপর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ইতিমধ্যে নয়াদিল্লির স্বনামধন্য কনস্টিটিউশন ক্লাবে পৌঁছে গেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, নতুন এই বৈঠকে শিক্ষার্থীদের অবশিষ্ট মৌলিক দাবিগুলো-বিশেষ করে প্রশ্নফাঁসের জেরে আত্মাহুতি দেওয়া শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য এক কোটি রুপি করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং বিগত দিনগুলোতে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্মম পুলিশি হামলার সুষ্ঠু বিচার-নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে।
তবে আজকের এই নতুন পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনা চলমান এই শান্তি আলোচনাকে আরও জটিল ও দীর্ঘায়িত করে তুলতে পারে বলে মত প্রকাশ করেছেন প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সমগ্র ভারতবাসী এখন গভীর উৎকণ্ঠা ও আশার সঙ্গে অপেক্ষা করছে, সংঘাত এড়িয়ে কীভাবে এই জাতীয় সংকটের একটি সম্মানজনক, যৌক্তিক ও টেকসই সমাধান বেরিয়ে আসে।