চিকিৎসা গ্রহণের পরিবেশকে তিনি উত্তর কোরিয়ার কঠোর বিধিনিষেধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। গত ১৮ জুলাই ভোরে চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশিকার কথা উল্লেখ করে পুলিশ তাকে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর থেকে জোরপূর্বক হাসপাতালে নিয়ে যায়।
সেখানে তাকে যে ধরনের নজরদারি ও কড়াকড়ির মধ্যে রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। ৫৯ বছর বয়সি এই বিশিষ্ট সমাজকর্মী ভারতের ব্যঙ্গাত্মক অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টির বা সিজেপি-এর চলমান ছাত্র আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে গত ২৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন।
শুক্রবার গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ২৪ মিনিটের একটি বিস্তারিত ভিডিও বার্তায় সোনম ওয়াংচুক তার এই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন যে, দিল্লির সফদারজং হাসপাতালটি কেবল একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল না, বরং এটিকে একটি সামরিক ক্যান্টনমেন্ট বা আস্ত কারাগারে পরিণত করা হয়েছিল।
তার দাবি, তাকে এমন এক দমবন্ধ করা পরিবেশে রাখা হয়েছিল, যেভাবে হয়তো একজন দুর্ধর্ষ বন্দিকেও রাখা হয় না। হাসপাতালে তার ওপর সব ধরনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। ঘরের বাইরে এক পা ফেলারও কোনো অনুমতি তার ছিল না। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তার ঘরের আশপাশে একটি মাছি গলারও উপায় ছিল না।
বাইরের কোনো মানুষের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি তাকে দেওয়া হয়নি, কেবল তার পরিবারের তিনজন সদস্যকে সেখানে থাকার ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। লাদাখের এই জনপ্রিয় সমাজকর্মী আরও অভিযোগ করেন যে, চিকিৎসার পুরোটা সময় তাকে কোনো মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ কাছে রাখতে দেওয়া হয়নি।
বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। বাধ্য হয়ে তিনি তার অগণিত সমর্থকের জন্য কাগজের ন্যাপকিনে ছোট ছোট নোট লিখে পাঠাতেন, কিন্তু পুলিশি পাহারায় কখনো কখনো সেই ন্যাপকিনগুলোও নির্মমভাবে বাজেয়াপ্ত করা হতো।
এই চরম শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, তার কাছে মনে হচ্ছিল যেন তিনি উত্তর কোরিয়ার মতো কোনো রুদ্ধ দেশে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে দিল্লি হাইকোর্টের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে মঙ্গলবার তাকে গুরুগ্রামের বেসরকারি মেদান্তা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
তবে সোনম ওয়াংচুকের অভিযোগ, মেদান্তা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আইনি অনুমতি পাওয়ার পরও বেশ কয়েক ঘণ্টা তাকে সফদারজং হাসপাতাল থেকে বের হতে অন্যায়ভাবে বাধা দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, স্থানান্তরের পর বেসরকারি হাসপাতাল মেদান্তাকেও পুলিশ কার্যত আরেকটি ক্যান্টনমেন্টে পরিণত করে।
তিনি জানান, তার ঘরের ঠিক বাইরেই সার্বক্ষণিক পাঁচ থেকে দশ জন পুলিশ সদস্য এবং হাসপাতালের নিচে দুই থেকে তিনশ পুলিশ কর্মী সর্বক্ষণ মোতায়েন ছিল। পুরো হাসপাতালটিকে এক ধরনের সামরিক ক্যাম্পে রূপান্তর করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
সেখানেও তাকে বাইরের কারও সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং চলাফেরার ক্ষেত্রে আগের মতোই নানা কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছিল। সোনম ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি অ্যাংমো শনিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি বিবৃতি দিয়ে এই নজিরবিহীন পুলিশি পাহারার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
তিনি প্রশ্ন তুলে লেখেন যে, সফদারজং এবং মেদান্তা-উভয় হাসপাতালেই পুলিশের এমন বাড়াবাড়ি কেন? প্রধান ফটক, অভ্যর্থনা কক্ষ, লিফট থেকে শুরু করে সোনম ওয়াংচুকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউর বাইরেও পুলিশের সশস্ত্র উপস্থিতি ছিল।
সোনমের সঙ্গে কে দেখা করতে পারবে আর কে পারবে না, তা চিকিৎসকের বদলে সম্পূর্ণভাবে পুলিশ নির্ধারণ করছিল। আদালত যখন আগেই স্পষ্ট করে জানিয়েছিল যে তিনি কোনো আটক বন্দি নন, তখন ঠিক কোন আইনি কর্তৃত্ববলে পুলিশ এই ধরনের অমানবিক আচরণ করছে, তা নিয়ে তিনি গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
উল্লেখ্য, ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষা বা নিট-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম, শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং এসব ব্যর্থতার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে বিশাল আন্দোলন গড়ে ওঠে।
এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়েই সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেছিলেন। টানা আন্দোলনের পর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘোষণার পাশাপাশি বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পর তিনি তার অনশন ভঙ্গ করেন।
সরকার লিখিতভাবে এই মর্মে আশ্বাস প্রদান করেছে যে, গত সোমবার সিজেপি-র ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারী কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আইনি মামলা দায়ের করা হবে না। এছাড়া, শিক্ষাক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে দেশের সংসদে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
একই সঙ্গে, নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি কেন্দ্র করে যেসব শিক্ষার্থী হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন, তাদের পরিবারগুলোকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অত্যন্ত মানবিক বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।