চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার প্রথম দিন থেকেই তিনি এর সম্পূর্ণ নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এবং উদ্ভূত এই সংকটজনক পরিস্থিতি থেকে কখনোই মুখ ফিরিয়ে নেননি।
খোলা চিঠিতে বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক ও কর্মজীবনের কথা স্মরণ করে জানান যে, গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের প্রতি গভীরভাবে নিবেদিত ছিলেন।
একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দূরদর্শী শিক্ষাব্যবস্থাই যে একটি সশক্ত ও আধুনিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিপ্রস্তর, সে বিষয়ে তাঁর অবিচল বিশ্বাসের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে গত ৩ মে ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় যে অনাকাঙ্ক্ষিত অনিয়মের ঘটনা ঘটে, তা তাঁর জন্য অত্যন্ত বেদনার ছিল বলে জানান ধর্মেন্দ্র প্রধান।
তিনি উল্লেখ করেন, অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসামাত্রই ভারত সরকার তা তাৎক্ষণিকভাবে আমলে নেয় এবং পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের ভার কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআইয়ের হাতে অর্পণ করে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে ওই বিতর্কিত পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়।
একই সঙ্গে, পরীক্ষা ব্যবস্থায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আগামী বছর থেকে এই জাতীয় পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ কম্পিউটারভিত্তিক বা সিবিটি পদ্ধতিতে নেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী তাঁর চিঠিতে আরও বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, সংকটকালীন ওই সময়ে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল দেশের ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষা পুনরায় অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে সম্পন্ন করা।
কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্য সরকার এবং বিশেষ করে জেলা প্রশাসনগুলোর সর্বাত্মক প্রয়াস ও নিরলস পরিশ্রমে সেটি সম্ভব হয়েছে। এছাড়া সাধারণ শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের আন্তরিক সহযোগিতায় গত ২১ জুন ২০২৬ তারিখে অত্যন্ত সফলভাবে পুনরায় এই ভর্তি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।
তিনি দাবি করেন, শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্র বা পরীক্ষা-মাফিয়াদের কারণে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ যেন নষ্ট না হয়, সেটি নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর প্রধান সংকল্প।
এর ফলশ্রুতিতে গত ১৬ জুলাই ঘোষিত নিট-ইউজি পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়েছে, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা বহু মেধাবী শিক্ষার্থী অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন।
চিঠির শেষাংশে ধর্মেন্দ্র প্রধান সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক উত্তাপ নিয়ে নিজের গভীর হতাশা ও বেদনার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, এই সংকটময় মুহূর্তেও দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু ব্যক্তি সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভ্রান্ত করার এবং শিক্ষাব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছেন, যা তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করেছে।
গত দশ দিন ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরসহ দেশজুড়ে যে উত্তপ্ত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি জানান, ভারতের যুবশক্তি দেশের প্রকৃত চালিকাশক্তি। তরুণরা শুধু দেশের ভবিষ্যৎ নন, বরং নতুন ও উন্নত ভারতের মূল কারিগর।
এই যুবসমাজ যেন কোনোভাবেই বিভ্রান্তির চক্রব্যূহে আটকা না পড়ে এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপশক্তিগুলো যেন উদ্ভূত এই পরিস্থিতির কোনো অন্যায্য ফায়দা লুটতে না পারে, মূলত সেই দেশপ্রেমের চেতনা থেকেই তিনি পদত্যাগের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। তিনি চান না দেশের একজন শিক্ষার্থীরও ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হোক।
বরং সন্তানেরা যেন নিজেদের মূল্যবান সময় কেবল পড়াশোনা এবং সুন্দর ক্যারিয়ার গড়ার দিকে পরিপূর্ণভাবে মনোনিবেশ করতে পারে, সেই বৃহত্তর স্বার্থেই তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন।
বিদায়ী বার্তার একেবারে শেষে ধর্মেন্দ্র প্রধান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা, অগাধ বিশ্বাস এবং নিরন্তর সহযোগিতার জন্য তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার সকল সহকর্মী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ এবং যাঁদের সঙ্গে তিনি দীর্ঘকাল কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দেশসেবা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষাই তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যতেও তিনি এই ব্রতের প্রতি সর্বদা নিবেদিত থাকবেন বলে চিঠিতে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।