শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর মামলা প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণের দাবি মেনে নিল মোদি সরকার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর মামলা প্রত্যাহার ও ক্ষতিপূরণের দাবি মেনে নিল মোদি সরকার
ছবি : Collected

ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে সৃষ্ট স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ ছাত্র আন্দোলনের মুখে আরও নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার।

 

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের আকস্মিক পদত্যাগের পরপরই এবার রাজপথে আন্দোলনরত তরুণ বিক্ষোভকারীদের আরও দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দাবি মেনে নিয়েছে ভারত সরকার। এই তীব্র গণআন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদানকারী নতুন ধারার রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-এর শীর্ষ প্রতিনিধিরা শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, দেশজুড়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল আইনি অভিযোগ বা মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতি তারা অর্জন করেছেন।

 

একই সঙ্গে, প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির কারণে চরম মানসিক অবসাদ ও হতাশায় ভুগে যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মানজনক আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানেও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। শনিবার, ২৫ জুলাই গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে সিজেপি-এর শীর্ষ নেতারা সরকারের সঙ্গে তাদের চলমান দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও প্রতিশ্রুতির বিস্তারিত তথ্য অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

 

আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দ জানান, তাদের অন্যতম প্রধান ও অনড় দাবি ছিল যে, গণতান্ত্রিক আন্দোলন চলাকালীন শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দায়ের করা সকল প্রাথমিক তথ্য বিবরণী বা হয়রানিমূলক মামলা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।

 

তাদের এই সুনির্দিষ্ট দাবিটি কেবল রাজধানী দিল্লির ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই আবদ্ধ ছিল না; বরং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের দ্বারা শাসিত অন্যান্য রাজ্যগুলোতে দায়ের করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলোও নিঃশর্ত প্রত্যাহারের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল।

 

কেন্দ্রীয় সরকার অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়ে এই দাবি মেনে নিয়েছে এবং খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই সকল আইনি পদক্ষেপ বা মামলা প্রত্যাহারের আনুষ্ঠানিক আশ্বাস প্রদান করেছে। আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে সিজেপি নেতারা আরও জানিয়েছেন যে, সরকার তাদের পূর্ণাঙ্গভাবে আশ্বস্ত করেছে এবং দায়ের করা সকল মামলার আনুষ্ঠানিক অনুলিপি বা কপি তাদের লিগ্যাল টিমের কাছে সরাসরি হস্তান্তর করবে।

 

সিজেপি-এর কাছে থাকা সর্বশেষ সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, কেবলমাত্র রাজধানী দিল্লিতেই এ পর্যন্ত বিক্ষোভরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ প্রশাসন। আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই এই মামলাগুলোর যাবতীয় নথিপত্র আন্দোলনকারীদের হাতে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

শুধু মৌখিক আশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে, বিষয়টির পাকাপোক্ত আইনি নিশ্চয়তার জন্য সিজেপি-এর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একটি খসড়া চুক্তিপত্র বা গ্যারান্টি পেপার জমা দেওয়া হয়েছে। সরকারি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে তারা এই বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ও লিখিত নিশ্চয়তাপত্র প্রদান করবে।

 

আন্দোলনকারীরা অত্যন্ত আশাবাদী যে, মঙ্গলবারের মধ্যেই মামলা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের ওপর কোনো আইনি হয়রানি না করার বিষয়ে তারা সরকারের কাছ থেকে একটি সন্তোষজনক ও আইনসিদ্ধ লিখিত চুক্তি লাভ করতে সক্ষম হবেন।

 

অন্যদিকে, চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির মতো অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় নজিরবিহীন দুর্নীতির কারণে যেসব নিরীহ শিক্ষার্থী নিজেদের স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রীয় সমবেদনা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এই চুক্তির একটি অত্যন্ত মানবিক ও বড় অংশ।

 

সিজেপি-এর অন্যতম প্রভাবশালী নেতা সৌরভ দাস এই মর্মান্তিক প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, সরকারের উচ্চপদস্থ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও দীর্ঘ আলোচনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে আশ্বস্ত করেছে।

 

রাষ্ট্র ওই সকল হতভাগ্য শিক্ষার্থীর পরিবারকে সম্মানসূচক আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে। এই পদক্ষেপকে কেবল আর্থিক সহায়তাই নয়, বরং শিক্ষাকাঠামোর চরম ব্যর্থতার একটি প্রচ্ছন্ন রাষ্ট্রীয় দায় স্বীকার হিসেবেই মূল্যায়ন করছেন রাজনৈতিক ও সমাজ বিশ্লেষকরা।

 

উল্লেখ্য, ভারতের চিকিৎসাবিদ্যায় ভর্তির এই প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজধানী দিল্লির প্রাণকেন্দ্র ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর চত্বরে তীব্র রোদ ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে লাগাতার বিক্ষোভ ও অবস্থান ধর্মঘট পালন করে আসছিলেন হাজার হাজার তরুণ।

 

তাদের এই দীর্ঘস্থায়ী ও অহিংস আন্দোলনের সর্বপ্রধান দাবি ছিল, শিক্ষাব্যবস্থায় এই বিশাল বিপর্যয়ের দায়ভার নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। শনিবার সকালে একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত প্রধান দাবিটি পূরণ হয়েছে।

 

তবে সিজেপি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, তাদের আন্দোলন এখনও পুরোপুরি সমাপ্তির মুখ দেখেনি। ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং মামলা প্রত্যাহারের দাবি নীতিগতভাবে মেনে নেওয়া হলেও, বিক্ষোভ চলাকালে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মমভাবে লাঠিচার্জ ও শারীরিক নির্যাতন চালানো পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিটি এখনও অপূর্ণই রয়ে গেছে।

 

সেই সঙ্গে, স্বাধীন দেশের নাগরিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই সমগ্র কেলেঙ্কারি ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার জন্য সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে বলেও জোরালো দাবি জানিয়ে আসছেন রাজপথের অকুতোভয় আন্দোলনকারীরা।

 

- টাইমস অব ইন্ডিয়া