বিতর্কিত চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এর জেরে সৃষ্ট দেশব্যাপী অস্থিরতার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি অনুযায়ী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর, সরকারের পক্ষ থেকে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোও মেনে নেওয়ার লিখিত ও আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার পরপরই রাজপথে থাকা অগণিত বিক্ষোভকারীকে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছে সিজেপি নেতৃত্ব।
শনিবার বিকেলে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিজেপির শীর্ষ মুখপাত্র সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা। সরকারের পক্ষ থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেন ভারতের দুই প্রবীণ ও প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিং।
সংবাদ সম্মেলনে সিজেপি নেতারা গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো পর্যালোচনা করেছে এবং সেগুলো সম্পূর্ণরূপে মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে।
সরকারের এই ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং সদিচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ তারা অবিলম্বে এই লাগাতার কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত তিনটি মূল দাবির বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে নেতারা জানান, তাদের সর্বপ্রধান দাবি ছিল শিক্ষাব্যবস্থায় চরম ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, যা ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
এর পাশাপাশি তাদের আরও দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দাবি ছিল। প্রথমত, গণতান্ত্রিক এই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসন যেসব হয়রানিমূলক মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেছে, তা অনতিবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নজিরবিহীন দুর্নীতির কারণে চরম হতাশায় ভুগে যেসব নিরীহ ও মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের প্রতিটি পরিবারকে সম্মানজনক ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক কোটি রুপি প্রদান করতে হবে।
সরকার অত্যন্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুটি দাবিও সম্পূর্ণরূপে মেনে নিয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্দোলনের সমাপ্তি প্রসঙ্গে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, সরকার যেহেতু তাদের প্রতিটি ন্যায্য দাবি মেনে নিয়েছে এবং একটি সুষ্ঠু সমাধানের পথ তৈরি করেছে, তাই তারা এখন সব আন্দোলনকারীকে বিজয়ীর বেশে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তিনি সরকারের এই নমনীয় ও ইতিবাচক মনোভাবের প্রশংসাও করেন। দলের আরেক শীর্ষ মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা টানা ছত্রিশ দিনের এই কঠিন সংগ্রামের কথা স্মরণ করে বলেন, দীর্ঘ ছত্রিশ দিন রাজপথে নির্ঘুম ও ক্লান্তিকর আন্দোলনের পর সরকার অবশেষে তাদের কথা শুনেছে এবং দাবিগুলো মেনে নিয়েছে।
তারা এখন সবাইকে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ও সুশৃঙ্খলভাবে ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর বিক্ষোভস্থল থেকে সরে যাওয়ার বিনীত আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তাদের কোনো দাবিই উগ্র বা অযৌক্তিক ছিল না; এগুলো ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেঁচে থাকার ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের আর্তনাদ।
সরকার এখন পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে এগুলো মেনে নিয়েছে, যা তাদের জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয়। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, বিশেষ করে এনডিটিভির নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই দিল্লির যন্তর মন্তর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাইক ও শব্দযন্ত্রের মাধ্যমে বিশেষ ঘোষণা প্রদান করতে শুরু করেছে।
পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাষায় বিক্ষোভকারীদের অবগত করছে যে, সরকার তাদের দাবি মেনে নিয়েছে, তাই তারা যেন এখন সুশৃঙ্খলভাবে ওই এলাকা ত্যাগ করেন। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই তীব্র গণআন্দোলনের কারণে যন্তর মন্তর এবং এর আশপাশের এলাকার স্বাভাবিক জনজীবন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছিল।
নিরাপত্তার কারণে ওই এলাকার স্থানীয় বিপণিবিতান ও সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া, অনাকাঙ্ক্ষিত জনসমাগম ও যেকোনো প্রকার সহিংসতা এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওই এলাকার অন্তত ষোলো থেকে সতেরোটি মেট্রো স্টেশন পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল, যার ফলে সাধারণ যাত্রীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। আন্দোলনের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে দ্রুতই এই এলাকায় স্বাভাবিক জনজীবন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরায় ফিরে আসবে বলে আশা করছে স্থানীয় প্রশাসন।