সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিন বোন একই সাথে এক যুবককে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করছেন। এই অভূতপূর্ব ঘটনাটি প্রথমদিকে নিছক কোনো কনটেন্ট বা সাজানো নাটক বলে মনে হলেও, পরবর্তীতে পাত্র ও পাত্রীরা নিশ্চিত করেছেন যে এটি সত্যিই একটি বাস্তব বিবাহ।
প্রথাগত হিন্দু রীতিনীতি মেনে সম্পন্ন হওয়া এই বিয়ের দৃশ্য জনমনে যেমন বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে, তেমনি এটি আইনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে নানাবিধ প্রশ্নেরও উদ্রেক করেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচিত ওই তিন বোনের নাম সরোজ, সাবিত্রী এবং সন্তোষ।
তাদের বসবাস উত্তরপ্রদেশের আমরোহা জেলার ধোরিয়া গ্রামে। প্রকাশ্যে আসা ভিডিও ও স্থিরচিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, এই তিন নারী হিন্দু বিয়ের সাজে সজ্জিত হয়ে এক যুবকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন।
বিয়ের রীতি অনুযায়ী, ওই যুবক তার তিন নববধূর সাথে পবিত্র অগ্নিকুণ্ডকে সাক্ষী রেখে সাতবার প্রদক্ষিণ করেন এবং এরপর তাদের প্রত্যেকের কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন। এই অভিনব বিয়ের বর হিসেবে যে যুবককে দেখা গেছে, তার নাম বিকাশ, যিনি স্থানীয়ভাবে বিক্কু নামেও পরিচিত।
পেশাগতভাবে বিকাশ ওই নারীদের সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরির সময় ক্যামেরাম্যানের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে পাত্রীদের পারিবারিক পরিচয় নিয়ে সামান্য বিতর্ক রয়েছে; কেউ কেউ দাবি করছেন তারা তিনজন আপন বোন, আবার কারও মতে তাদের মধ্যে দুজন আপন এবং একজন চাচাতো বোন।
তবে তারা একত্রে একই পরিবারে বেড়ে উঠেছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। এমন একটি অস্বাভাবিক সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ হিসেবে ওই তিন বোন এক অত্যন্ত আবেগঘন ও সংবেদনশীল গল্প তুলে ধরেছেন। তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই তারা একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে বেড়ে উঠেছেন।
তাদের মধ্যকার সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে, বিয়ের পর স্বামী ও সংসারের খাতিরে একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাদের আশঙ্কা ছিল, আলাদা বিয়ে করলে তাদের চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হবে।
ভিডিও বার্তায় এই তিন বোনের একজন তাদের মানসিক অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে বড় হয়েছি এবং আলাদা থাকার কথা চিন্তাও করতে পারিনি। যখন আমরা বুঝতে পারি বিয়ে আমাদের আলাদা করে দেবে, আমরা আমাদের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম।
পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেই মরে যাওয়ার চেয়ে আমরা একজনকে বিয়ে করে একসঙ্গে থাকতে পারব। আমরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজ ইচ্ছায় এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তাদের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, তীব্র মানসিক আবেগ এবং একসাথে থাকার অদম্য বাসনা থেকেই তারা এমন একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।
উল্লেখ্য, এই তিন বোনের মধ্যে একজন স্নাতক পর্যায়ে বি-টেক ডিগ্রিতে অধ্যয়নরত আছেন এবং অপর দুজন দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নিজেদের পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন। অন্যদিকে, পাত্র বিকাশ জানিয়েছেন যে, তিনি একসঙ্গে তিন বোনকে বিয়ের এই প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন কারণ তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তারা একত্রে থাকার জন্য কতটা উদগ্রীব।
তাদের পারস্পরিক ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তিনি এই বিরল প্রস্তাবে রাজি হন। জানা যায়, এই আলোচিত বিয়ের অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়েছে হাসানপুর এলাকার মা চামুণ্ডা মন্দিরে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট মন্দির কর্তৃপক্ষ এই বিয়ের কথা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।
মন্দির কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, বর্তমানে মন্দিরটিতে সংস্কার কাজ চলমান থাকায় সেখানে তাদের নিজস্ব কোনো পুরোহিত উপস্থিত ছিলেন না। সুতরাং, এই বিয়ের বিষয়ে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন।
এই বিয়ের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে চারদিকে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে তাদের এই স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন এবং তাদের স্বাধীন ইচ্ছাকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে, একাধিক হিন্দু সংগঠন এই বিয়ের সমালোচনা করেছে এবং এর আইনি বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। ভারতের আইনি ব্যবস্থা, বিশেষ করে ১৯৫৫ সালের হিন্দু বিবাহ আইনের বিধান অনুযায়ী, দেশে বহুগামিতা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
উক্ত আইনের পঞ্চম ধারায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তির যদি জীবিত স্বামী বা স্ত্রী থাকেন, তবে তিনি পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না। অর্থাৎ, একসাথে একাধিক স্ত্রী বা স্বামী রাখা আইনত বৈধ নয়। যদি কেউ পূর্বের স্বামী বা স্ত্রী বেঁচে থাকা অবস্থায় আবার বিয়ে করেন, তবে সেই দ্বিতীয় বা পরবর্তী বিয়েটি অবৈধ হিসেবেই গণ্য হবে।