তিন দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর, ভারতের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী এবং সাবেক সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর কাছে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন যে, টেলিভিশনের পর্দায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সেই অমানবিক দৃশ্য দেখে তিনি অঝোরে কেঁদে ফেলেছিলেন।
গতকাল শনিবার, ৭ নভেম্বর প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে সোনিয়া গান্ধী মূলত ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের ওপর যে চরম আঘাত হানা হয়েছিল, তা নিয়ে তার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার এই মন্তব্য ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে নতুন করে দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সোনিয়া গান্ধী তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের কথা স্মরণ করতে গিয়ে দ্য গার্ডিয়ানকে অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "যে মুহূর্তে আমি টেলিভিশনের পর্দায় দেখলাম ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদটিকে উন্মত্ত জনতা ভেঙে ফেলছে, সেই দৃশ্য আমাকে মানসিকভাবে গভীরভাবে আহত করেছিল এবং আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে না পেরে কেঁদে দিয়েছিলাম।"
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ওই মুহূর্তটি তার কাছে কেবল একটি পুরোনো স্থাপত্য বা উপাসনালয় ধ্বংসের দৃশ্য ছিল না, বরং তা ছিল ভারতের বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর এক বিরাট ও সুপরিকল্পিত আক্রমণ।
তার মতে, ওই দিনটি তাকে এই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি করেছিল যে, আগামী দিনগুলোতে ভারতকে তার নিজস্ব ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র এবং সম্প্রীতির ঐতিহ্য রক্ষা করার জন্য এক দীর্ঘ, কঠিন এবং রক্তক্ষয়ী আদর্শিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এই উপলব্ধির পর থেকেই তিনি ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের এক অন্ধকার দিক দেখতে পেয়েছিলেন বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। এই ঘটনাটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ওই সময়ে ভারতের উত্তর প্রদেশে চরমপন্থি হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্বে 'রামজন্মভূমি আন্দোলন' চরম আকার ধারণ করেছিল।
তাদের মূল অভিযোগ ও বিশ্বাস ছিল যে, মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মির বাকি ষোড়শ শতাব্দীতে অযোধ্যায় ভগবান রামের জন্মস্থানে অবস্থিত একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে তার ওপর এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। এই বিতর্কিত দাবিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে।
সে সময় উগ্র করসেবকদের এক বিশাল উন্মত্ত সমাবেশ ঐতিহাসিক এই মসজিদটিকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। সোনিয়া গান্ধী তার সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ওই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির এবং তাদের সমমনা উগ্রপন্থি সংগঠনগুলোর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ মদত ছিল।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা এবং কংগ্রেসের পূর্বসূরিদের স্বপ্নের কথা স্মরণ করে সোনিয়া গান্ধী অত্যন্ত দৃঢ় ভাষায় বলেন, "আমি সেই দিন গভীরভাবে অনুভব করেছিলাম যে, জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং তাদের অন্যান্য সহকর্মীরা যে স্বাধীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই ভারত এক চরম ও কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে যাচ্ছে।"
কংগ্রেস নেত্রীর এই বক্তব্য মূলত স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভারতের সংবিধানের মূল ভিত্তিই হলো সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব না করা। কিন্তু বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা সেই সাংবিধানিক ভিত্তিমূলকেই মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছিল।
তবে এই সাক্ষাৎকারের অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো সোনিয়া গান্ধীর আত্মসমালোচনা। তিনি অত্যন্ত অকপটে স্বীকার করেছেন যে, ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টি এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আজকের যে বিশাল উত্থান ঘটেছে, তার পেছনে কংগ্রেসেরও কিছু ঐতিহাসিক ভুল এবং পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে কংগ্রেসের নেওয়া কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্ত চরমপন্থিদের জন্য একটি উর্বর রাজনৈতিক জমি তৈরি করে দিয়েছিল। সোনিয়া গান্ধীর এই স্বীকারোক্তি ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত, যেখানে একজন শীর্ষ নেতা নিজ দলের অতীত রাজনৈতিক দুর্বলতা বা কৌশলগত ত্রুটিগুলোকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে এতটা খোলামেলাভাবে মেনে নিয়েছেন।
এটি তার পরিণত রাজনৈতিক চিন্তাধারার একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে, সোনিয়া গান্ধীর এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ্যে আসার পরপরই ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় এর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে কংগ্রেসকে সরাসরি 'হিন্দু বিরোধী' এবং 'সংখ্যালঘু তোষণকারী' দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি তার বার্তায় তীব্র কটাক্ষ করে লিখেছেন, “সোনিয়া গান্ধী বাবরি মসজিদের জন্য চোখের পানি ফেলেন, সোনিয়া গান্ধী বাটলা হাউজ এনকাউন্টারে নিহতদের জন্যও চোখের পানি ফেলেন।
তার এই কান্না মূলত প্রমাণ করে যে কংগ্রেস দল আগাগোড়াই বাবরপন্থি এবং ভগবান রাম বিরোধী।” প্রদীপ ভাণ্ডারি আরও দাবি করেন যে, কংগ্রেসের এই ধরনের বিভাজনমূলক এবং তুষ্টিকরণের রাজনীতির কারণেই ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং এর ফলে আগামী দিনগুলোতে সোনিয়া গান্ধীর দলের ভোট ব্যাংক আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর ভারতজুড়ে যে ভয়াবহ হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সেই সংঘাতের রেশ এবং ধর্মীয় মেরুকরণের প্রভাব ভারতের সমাজ ও রাজনীতিতে আজও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অন্যদিকে, ভারতীয় জনতা পার্টির দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের ঠিক ওই বিতর্কিত স্থানেই একটি বিশাল ও আড়ম্বরপূর্ণ রামমন্দির নির্মাণ করা।
দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সেই পথ প্রশস্ত হয় এবং ২০২৪ সালে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং সেই বহুল আকাঙ্ক্ষিত রামমন্দিরের উদ্বোধন করে দলের সেই পুরোনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেন।
রামমন্দির নির্মাণের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দল তাদের রাজনৈতিক অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করলেও, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সমাজকাঠামো নিয়ে বিতর্ক কখনোই থেমে থাকেনি। সোনিয়া গান্ধীর সাম্প্রতিক এই মন্তব্য যেন সেই পুরোনো আদর্শিক সংঘাতকে আবারও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে তার এই বক্তব্য এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলমানদের অধিকার এবং তাদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন অধিকারকর্মীরা প্রতিনিয়ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সোনিয়া গান্ধীর এই মন্তব্য কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, বরং এটি ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ওপর একটি গভীর পর্যবেক্ষণ। তবে ক্ষমতাসীন দলের পাল্টা আক্রমণ প্রমাণ করে যে, ধর্ম এবং রাজনীতির এই জটিল রসায়ন থেকে ভারতের সহসা বেরিয়ে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগামী দিনগুলোতেও যে এই বিতর্ক বারবার ফিরে আসবে, তা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকেই অত্যন্ত সুস্পষ্ট।