তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, আগামী ২০২৯ সালের বহুল প্রতীক্ষিত লোকসভা নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের চূড়ান্ত পতন ঘটবে এবং দেশটিতে রাজনৈতিক পালাবদল অবশ্যম্ভাবী।
একই সঙ্গে তিনি ভারতের আপামর জনসাধারণকে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতায় এই ঐতিহাসিক ও গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার এবং ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
শনিবার ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়ার (পিটিআই) প্রকাশিত একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে এই সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে নিয়ে আসা হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে আয়োজিত এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি এই মন্তব্য করেন।
জানা গেছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবং ভারতের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এই প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়েছিল।
ওই প্রতিবাদ সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থেকে অভিজিৎ দীপকে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে তার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো স্বৈরতান্ত্রিক বা জনবিরোধী সরকারের পরিবর্তন কেবল মাত্র একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই আসতে পারে।
এই কারণেই তিনি দেশটিতে পুনরায় একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের জোর দাবি উত্থাপন করেন। তার মতে, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল সত্যিকারের ক্ষমতার পালাবদল সম্ভব।
তরুণ প্রজন্মের এই উদীয়মান নেতা তার বক্তব্যে বর্তমান ক্ষমতাসীন এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বিতর্কিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কার্যত দেশের সমগ্র যুবসমাজের বিরুদ্ধে এক অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
অভিজিৎ দীপকে উপস্থিত জনতার সামনে একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জানতে চান, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জ্ঞানেশ কুমারের মতো একজন আমলা কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন, যার জন্য সরকার দেশের তরুণ নাগরিকদের কণ্ঠস্বর পর্যন্ত রোধ করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না।
তার এই প্রশ্ন মূলত ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সম্ভাব্য আঁতাতের বিষয়ে জনমনে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সন্দেহকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে।
নিজের এবং তার সহযোদ্ধাদের কারাবরণের এক অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ও বেদনাবিধুর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে দীপকে স্মরণ করেন নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ঘটা সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা। তিনি জানান, ভারতের পবিত্র জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণভাবে প্রবেশ করার মতো একটি সাধারণ ও দেশপ্রেমমূলক কাজের অপরাধে তাকে এবং তার রাজনৈতিক দল সিজেপির আরও দুই শীর্ষ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার করেছিল।
এই ঘটনাকে তিনি চরম অবমাননাকর আখ্যা দিয়ে অত্যন্ত আবেগময় কণ্ঠে বলেন যে, তিনি দেশের যে প্রান্তেই যান না কেন, ভারতের মর্যাদার প্রতীক এই জাতীয় তেরঙ্গা পতাকা সব সময় পরম শ্রদ্ধায় নিজের বুকে ধারণ করবেন।
তিনি ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, দেশের জাতীয় পতাকা উঁচিয়ে ধরার মতো একটি পবিত্র কাজের জন্যই তাদের মতো তরুণদের গারদের পেছনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তার দুই ভাইতুল্য সহযোদ্ধা সৌরভ এবং আশুকেও ঠিক একই অভিযোগে দীর্ঘসময় কারারুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল।
এই নজিরবিহীন ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভারতের মাটিতে কোনো স্বাধীন নাগরিককে জাতীয় পতাকা বহনের জন্য গ্রেপ্তার করার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা শেষবার ঘটেছিল সেই পরাধীন ব্রিটিশ আমলে, যখন ভারত ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল।
বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের এমন আচরণকে তিনি সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়নমূলক নীতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। বিজেপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান ক্ষমতাসীন এনডিএ সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন এবং নাগরিক স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন যে, রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছু সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার এক গভীর ও সুপরিকল্পিত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
সরকারের দমনপীড়নের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এই অকুতোভয় তরুণ নেতা দৃপ্তকণ্ঠে বলেন যে, সরকার যদি তাকে গ্রেপ্তার করতে চায়, তবে তারা চাইলে তাকে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, কেরালা কিংবা তামিলনাড়ুর মতো যেকোনো রাজ্য থেকেই গ্রেপ্তার করতে পারে।
কিন্তু দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকেই তাকে বন্দি করা হোক না কেন, তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আবারও ফিরে আসবেন এবং ঠিক একইভাবে দেশের গণতন্ত্র ও মুক্তির প্রতীক এই তেরঙ্গা পতাকা উঁচিয়ে ধরবেন।
তিনি অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন যে, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ধীরে ধীরে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অত্যন্ত গোপনীয় ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেছে। সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে কী খাবে, তাদের খাদ্যাভ্যাস কেমন হবে, তারা ব্যক্তিগত জীবনে কাকে ভালোবাসবে বা কাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেবে-এই সব কিছুই রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
শুধু তা-ই নয়, নাগরিকরা গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে কাকে ভোট দেবেন, সেটিও এখন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই সূত্র ধরেই তিনি দাবি করেন যে, আসন্ন নির্বাচনগুলোতে ভোটগ্রহণের ফলাফলকে সম্পূর্ণ নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করার হীন উদ্দেশ্যেই ভোটার তালিকার এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জেন-জি প্রজন্মের অধিকার আদায়ের এই অবিসংবাদিত নেতা আরও বলেন, ক্ষমতাসীনরা প্রথমে নাগরিকদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, এরপর তারা নাগরিকদের ব্যক্তিগত প্রেম ও বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, আর এখন তারা এমন এক ভয়ংকর স্বৈরতান্ত্রিক পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে, যেখানে তারা সরাসরি নাগরিকদের পবিত্র ভোটাধিকারকেও নিজেদের কুক্ষিগত করতে চাইছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বাধীন ভারতের মূল ভিত্তিগুলো কখনোই এমন বিভাজনের রাজনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বরং বাবাসাহেব ডক্টর বি আর আম্বেদকর, জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মতো মহান নেতাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক, ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক আদর্শের ওপর ভর করেই এই বৈচিত্র্যময় দেশটির শক্তিশালী ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বিগত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে দেশের আপামর জনসাধারণ এক প্রকার ভীতি ও নীরবতার চাদরে ঢাকা পড়েছিল। দেশ যেন তার নিজস্ব প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলেছিল।
তবে যন্তর মন্তরে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের যে স্বতঃস্ফূর্ত এবং সাহসী প্রতিবাদ সংঘটিত হয়েছে, তা দেশের সাধারণ মানুষকে তাদের হারিয়ে যাওয়া সেই গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর এবং সাহসিকতা পুনরায় ফিরে পেতে দারুণভাবে সাহায্য করেছে বলে তিনি মনে করেন।
ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলতে শুরু করার পর থেকেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে তরুণ ও ছাত্র আন্দোলনকারীদের ওপর চরম দমনপীড়ন ও পুলিশি হয়রানি চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ককরোচ পার্টির এই প্রতিষ্ঠাতা প্রধান।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান যে, বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপির মূল রাজনৈতিক কৌশলই হলো ধর্মের ভিত্তিতে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে বিভাজিত করা এবং নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চূড়ান্ত উদ্দেশ্যে সমাজে প্রতিনিয়ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও উত্তেজনা জিইয়ে রাখা।
দেশের অধিকার সচেতন তরুণদের সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রীরা যখন 'অরাজকতাবাদী' বলে আখ্যায়িত করছেন, তখন এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দীপকে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন, "এ দেশের তরুণ প্রজন্মকে আপনারা অরাজকতাবাদী বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী বলে অপবাদ দিচ্ছেন।
কিন্তু না মহাশয়, আমরা কোনোভাবেই অরাজকতাবাদী নই। আমরা মহান আম্বেদকরের অনুসারী, আমরা অহিংসার পূজারি গান্ধীবাদী। তাই আমাদের অরাজকতাবাদী বলার মতো দুঃসাহস বা স্পর্ধা আপনারা দেখাবেন না।"
ভারতের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে বলেন যে, তিনি কখনোই এমন কথা বলছেন না যে অতীতের সরকারগুলো একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা বা নিখুঁত ছিল।
পূর্ববর্তী সরকারগুলোরও অনেক রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক ত্রুটি ছিল। কিন্তু তৎকালীন ভারতের সমাজব্যবস্থা ও রাজনৈতিক পরিবেশ বর্তমান সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও উন্মুক্ত ছিল। সেই সময় সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মীদেরও দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর কাজের কঠোর সমালোচনা করার পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল।
আর একটি প্রকৃত, স্বাস্থ্যকর ও কার্যকরী গণতন্ত্রের রূপরেখা ঠিক এমনই হওয়া উচিত বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। উল্লেখ্য, রাজেন্দ্র ময়দানে আয়োজিত ওই বিশাল প্রতিবাদ সভায় সব শ্রেণি-পেশা ও নানা বয়সের বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী এবং অধিকারকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বিভিন্ন প্রগতিশীল যুব সংগঠন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের শীর্ষ নেতারাও এতে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সভার পাশাপাশি সেখানে প্রতিবাদী ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও পরিবেশন করা হয়।
এর আগে প্রখ্যাত অভিনেতা ও সমাজকর্মী প্রকাশ রাজের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে মেরিন ড্রাইভ থেকে রাজেন্দ্র ময়দান পর্যন্ত এক বিশাল ও জনসমুদ্রতুল্য প্রতিবাদ মিছিল বের করা হয়, যা ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক আবহে এক নতুন মাত্রার যোগ করেছে। প্রতিবেদনটির মূল সূত্র হিসেবে ইন্ডিয়া টুডে-এর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।