বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে বগুড়া সদর উপজেলার চালিতাবাড়ি এলাকায় এই সহিংস ঘটনা ঘটে, যা স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং প্রাথমিক তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।
ইতোমধ্যে এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহে শাপলা নামের এক নারীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, নিহত আতিকুর রহমান সাগর মণ্ডল বগুড়া সদর উপজেলার শাখারিয়া ইউনিয়নের পাঁচবারিয়া গ্রামের শাহাদাত মণ্ডলের সন্তান এবং তিনি ওই ইউনিয়নের ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং নিহতের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, বেশ কিছুদিন ধরে প্রতিবেশী এবং আপন কিছু আত্মীয়ের সঙ্গে সাগর মণ্ডলের চরম বিরোধ চলে আসছিল। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি নিজ গ্রাম ছেড়ে স্ত্রী মারজিয়া খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে তার শ্বশুরবাড়ি চালিতাবাড়ি গ্রামে বসবাস শুরু করেছিলেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেখানেও তিনি শেষ রক্ষা পাননি। বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক দুইটার দিকে পরিবারের সদস্যরা যখন ঘরের ভেতর রাতের খাবার গ্রহণ করছিলেন, তখন সাগর মণ্ডল বাড়ির উঠানে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন।
হঠাৎ করেই বাড়ির বাইরে প্রচণ্ড হইচই ও আক্রমণাত্মক চিৎকার শুনতে পেয়ে তার স্ত্রী মারজিয়া খাতুন দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। উঠানে পা রাখতেই তিনি এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান। সাগরের আপন জেঠাতো ভাই জুলহাসের নেতৃত্বে অন্তত বিশ থেকে পঁচিশ জনের একটি দল বাড়ির টিনের মূল ফটক ভেঙে জোরপূর্বক ভেতরে প্রবেশ করে।
দুর্বৃত্তদের হাতে থাকা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তারা অত্যন্ত নির্মমভাবে সাগর মণ্ডলকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে গুরুতর আহত অবস্থায় সাগর মণ্ডল কোনো রকমে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি বাড়ির সামনের রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। নিহতের স্ত্রী মারজিয়া খাতুন সেই ভয়াবহ রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে জানান, নিজের চোখের সামনে স্বামীকে এমন পৈশাচিকভাবে আক্রান্ত হতে দেখে তিনি চিৎকার করে স্থানীয়দের কাছে সাহায্য চাইতে থাকেন।
কিন্তু আক্রমণকারীরা তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে উল্টো তাকেও প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি প্রদান করে। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সহায়তায় মুমূর্ষু অবস্থায় সাগরকে একটি তিন চাকার যানে (সিএনজিচালিত অটোরিকশা) করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু সেই জরুরি মুহূর্তেও আক্রমণকারীরা তাদের পিছু ছাড়েনি। তারা মানিকচকের দিকে শাওন নামের এক ব্যক্তির বাড়ির কাছাকাছি এসে আবারও তাদের পথরোধ করার অপচেষ্টা করে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে।
দীর্ঘ বাধা বিপত্তির পর অবশেষে প্রতিবেশীর বাড়ির একটি গলি থেকে সাগরকে উদ্ধার করে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর নিহত সাগরের পরিবারে শোকের কালো ছায়া নেমে এসেছে। পুত্রহারা এক অসহায় মায়ের আর্তনাদে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহতের মা সাজেদা বেগম উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে তার সন্তান হত্যার ন্যায়বিচার দাবি করেন।
তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে জানান যে, তার সন্তানকে অত্যন্ত নির্মম ও পাশবিক কায়দায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে গুরুতর আহত অবস্থায় তার ছেলে যখন একটু তৃষ্ণার জলের জন্য ছটফট করছিল, তখন খুনিরা তাকে এক ফোঁটা জলও পান করার সুযোগ দেয়নি।
একজন শোকসন্তপ্ত মা হিসেবে তিনি দেশের সরকারপ্রধানের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের প্রার্থনা করেছেন। সার্বিক বিষয়ে বগুড়া সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ আলম গণমাধ্যমের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেছেন।
তিনি জানান, রাতের বেলা এই ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশের একটি দলকে ঘটনাস্থলে প্রেরণ করা হয়। পুলিশি সুরক্ষায় নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশের ধারণা, পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে আতিকুর রহমান সাগর মণ্ডলকে হত্যা করা হয়েছে।
প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে শাপলা নামের এক নারীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, নিহত সাগর মণ্ডলের অতীত অপরাধমূলক ইতিহাস সম্পর্কেও পুলিশ তথ্য সরবরাহ করেছে। পরিদর্শক মাহফুজ আলম উল্লেখ করেন, নিহত এই সাবেক ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে এর আগে মারামারি, মাদক ব্যবসা এবং অস্ত্র নিজ হেফাজতে রাখার মতো একাধিক অভিযোগে মোট ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ যাই হোক না কেন, পুলিশ অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে পুরো বিষয়টি তদন্ত করছে। প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।