শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেপ্টেম্বরের অধিবেশনেই নির্বাচিত হবেন নতুন রাষ্ট্রপতি, বিশেষ অধিবেশনের প্রয়োজন নেই- আইনমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুলাই, ২০২৬, ০১:০৯ পিএম

সেপ্টেম্বরের অধিবেশনেই নির্বাচিত হবেন নতুন রাষ্ট্রপতি, বিশেষ অধিবেশনের প্রয়োজন নেই- আইনমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ নিয়ে চলমান জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে সরকার নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট করেছে। দেশের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশনেই দেশের পরবর্তী ও নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হবে।

 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আলাদাভাবে কোনো বিশেষ সংসদ অধিবেশন ডাকার মতো জরুরি বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বর্তমানে দেশে তৈরি হয়নি বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন। সরকারের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পালাবদলের প্রক্রিয়াটি একটি সুনির্দিষ্ট ও আইনি কাঠামোর মধ্যে এসে দাঁড়াল।

 

সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর থেকেই রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ও সুশীল সমাজে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে যে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল, আইনমন্ত্রীর এই সুচিন্তিত ও সময়োচিত বক্তব্যে তা অনেকটাই স্থিতিশীলতা লাভ করেছে।

 

শনিবার, ২৫ জুলাই, রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় আইনমন্ত্রী এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যগুলো গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।

 

দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলার অবস্থা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের জবাবদিহিতার বিষয়ে সাংবাদিকদের করা তীক্ষ্ণ প্রশ্নের অত্যন্ত সাবলীল ও পেশাদার উত্তর দেন তিনি।

 

সংবাদ সম্মেলনের একপর্যায়ে সাংবাদিকরা সদ্য পদত্যাগকারী সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা ও আইনি পদক্ষেপের ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী অত্যন্ত পরিমিত ও দায়িত্বশীল ভাষায় নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেন।

 

তিনি জানান, রাষ্ট্রের সাবেক প্রধানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে এই মুহূর্তে আগাম কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না, কারণ বিষয়টি সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ এবং আইনি কাঠামোতেই এর যথোপযুক্ত সমাধান হবে।

 

আইন ও বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কথাও আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে জোরালোভাবে উঠে আসে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামে অংশগ্রহণকারী আটজন সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে, সুষ্ঠু তদন্তে সেগুলো যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে দ্রুততার সাথে তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।

 

নিরীহ নাগরিকদের কোনোভাবেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি হয়রানির শিকার হতে দেওয়া হবে না। তবে অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে সরকারের শূন্য সহনশীলতা নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে যতই প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর হোন না কেন, ধর্ষণের মতো গুরুতর ও জঘন্য অপরাধের কোনো মামলা কখনোই প্রত্যাহার করা হবে না।

 

একই সাথে তিনি দেশের সীমান্ত নিরাপত্তার একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে জানান যে, বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সরকার সফল হয়েছে।

 

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং নতুন নির্বাচনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছিলেন।

 

দেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধান অনুযায়ী তার পাঁচ বছরের মেয়াদকাল ২০২৮ সালের এপ্রিলে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মেয়াদের প্রায় দুই বছর বাকি থাকতেই শারীরিক অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে তিনি নিজ পদ থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

 

সংবিধানের সুনির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ কোনো কারণে শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

 

এই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এখন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রের অভিভাবকের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার নব্বই দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

 

সেপ্টেম্বরের সংসদ অধিবেশনটি এই নব্বই দিনের সময়সীমার মধ্যেই পড়ায় নির্বাচন প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক নিয়মেই সম্পন্ন হবে বলে নিশ্চিত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের প্রায় তিন বছরের সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত ঘটনাবহুল মেয়াদকাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

 

তার দায়িত্ব পালনের সময়টিতেই দেশ এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাক্ষী হয়। ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অভাবনীয় পতন ঘটে। এই অস্থিতিশীল ও সংকটময় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তিনি একটি রূপান্তরকালীন ভূমিকা পালন করেন।

 

পরবর্তীতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার পর দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মাত্র তিন বছরের মেয়াদকালে দেশের তিনজন ভিন্ন ভিন্ন সরকারপ্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করানোর এক বিরল নজির তিনি স্থাপন করেছেন, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ইতিহাসে এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।