শনিবার রাজধানী ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত নভোথিয়েটারে আয়োজিত 'জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বায়োটেকনোলজি, ইলেকট্রনিকস, এআই অ্যান্ড রোবোটিকস (বিইএআর) সামিট'-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক মানের সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী শিল্পের বিকাশে সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে নিশ্চিত করেন যে, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য একটি সম্পূর্ণ ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকার ইতোমধ্যে সর্বাত্মক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন, আকর্ষণীয় কর সুবিধা প্রদান, শুল্কমুক্ত বা বন্ডেজ সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং বিশেষায়িত অবকাঠামো নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে এক ছাদের নিচে সব সেবা বা 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস'-এর ব্যবস্থাকে আরও বেশি কার্যকর ও গতিশীল করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান বিশ্বের প্রযুক্তিগত বিবর্তনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব আজ এমন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি সম্মিলিতভাবে চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করেছে।
তার মতে, বর্তমান যুগে সেমিকন্ডাক্টর কেবল একটি সাধারণ শিল্প নয়, বরং এটি সমগ্র আধুনিক সভ্যতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে মানুষের হাতের মুঠোফোন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত কম্পিউটার, অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, কৃষিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি, জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যকেন্দ্র, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক কলকারখানা এবং মহাকাশে প্রেরিত কৃত্রিম উপগ্রহ-প্রতিটি ক্ষেত্রে সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবহার অপরিহার্য।
এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে একটি মাইক্রোচিপ বা ক্ষুদ্র অর্ধপরিবাহী। আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাজার বর্তমানে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, বৈদ্যুতিক যানবাহন, বুদ্ধিমান বা স্মার্ট যন্ত্র, পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রজন্মের যোগাযোগব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির অভাবনীয় বিস্তারের কারণে বিশ্বজুড়ে চিপের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বৈশ্বিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, ২০৩০ সালের দিকে বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে। তবে বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যেই সেই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বিশাল ও সম্ভাবনাময় বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করার জন্য বাংলাদেশের সামনেও এখন এক অভাবনীয় সুযোগ উন্মুক্ত হয়েছে। নিজেদের অদম্য মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশের একটি সম্মানজনক ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরির এখনই উপযুক্ত সময় বলে তিনি মনে করেন।
সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে রপ্তানি আয়ের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, বাংলাদেশ তা সফলভাবে পূরণে সক্ষম হবে বলে প্রধানমন্ত্রী গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের তিন হাজারেরও বেশি সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী মেধা ও দক্ষতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন।
প্রকৌশলী, স্থপতি, গবেষক, ব্যবস্থাপক এবং উদ্যোক্তা হিসেবে তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের যোগ্যতার অকাট্য প্রমাণ রেখে চলেছেন। প্রবাসে অবস্থানরত বিশ্বস্বীকৃত এই মেধাবী জনশক্তিকে বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সমৃদ্ধির পথে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে সরকারি ও বেসরকারি সব পর্যায় থেকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অগ্রগতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দেশে ইতোমধ্যে সেমিকন্ডাক্টর নকশা প্রণয়ন, যাচাইকরণ, প্রশিক্ষণ, এমবেডেড বা সন্নিবেশিত সিস্টেম, পাওয়ার ইলেকট্রনিকস এবং উন্নত প্যাকেজিংয়ের মতো জটিল ও উচ্চতর প্রযুক্তিগত খাতে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে।
দেশের বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে তাদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সফলভাবে প্রবেশ করেছে। সরকার এই সেমিকন্ডাক্টর খাতকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে বিবেচনা করছে।
তবে এই খাতের সার্বিক উন্নয়ন কেবল কোনো একটি একক মন্ত্রণালয় বা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়, বরং এটি একটি সম্মিলিত জাতীয় মিশন হিসেবে বাস্তবায়িত করতে হবে। এই বিশাল লক্ষ্য পূরণে বর্তমান সরকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এগিয়ে নিতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের চাহিদা অনুযায়ী সম্ভাব্য সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করেছে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব কাঁচামাল আমদানির ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি, সেমিকন্ডাক্টর নকশা সেবার রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ আর্থিক প্রণোদনা চালুর যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশাল স্টার্টআপ বা নবীন উদ্যোগ অনুদান তহবিল বরাদ্দ রেখেছে, যেখান থেকে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগকে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়া সম্প্রতি মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রচারণামূলক প্রদর্শনীর আয়োজন করে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টরের বিশাল সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের সঙ্গে তুলে ধরার জন্য সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তাদের তিনি আন্তরিক প্রশংসা করেন।
পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী বিদ্যমান বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করে বলেন, এই পথচলায় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি, উন্নত গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অত্যন্ত কঠিন প্রতিযোগিতার মতো বাধাগুলো সামনে রয়েছে। তবে সব সীমাবদ্ধতাকে সাহসিকতার সঙ্গে অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক অদম্য ইচ্ছা ও মানসিকতা জাতির রয়েছে।
তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে আশ্বস্ত করে প্রতিশ্রুতি দেন যে, দেশের এই অদম্য ইচ্ছাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বর্তমান সরকার তার সর্বোচ্চ সাধ্য ও সামর্থ্য দিয়ে সব সময় প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা ও গবেষকদের পাশে ছায়ার মতো রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।