সদ্য বিদায়ী সরকারের আমলে বহুল আলোচিত ও ব্যয়বহুল এই প্রকল্পে যেসব গুরুতর আর্থিক দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনার সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎকারীদের সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই পারস্পরিক আপস-মীমাংসা বা সমঝোতায় না যাওয়ার বিষয়ে সরকারের কঠোর নীতির কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন বর্তমান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
শনিবার সকালে গণমাধ্যমের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি সরকারের এই কঠোর নীতি ও আগামী দিনের আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, পতিত বিগত সরকারের সময়কালে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে যেসব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, তার মধ্যে রাজধানী ঢাকার প্রধান বিমানবন্দর সম্প্রসারণের এই প্রকল্পটি ছিল অন্যতম বৃহৎ একটি উদ্যোগ।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের ভাবমূর্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই বিপুল বাজেটের প্রকল্পটিতে নানামুখী অনিয়ম ও সীমাহীন দুর্নীতির অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ সর্বস্তরে উত্থাপিত হয়েছে।
বর্তমান প্রশাসন এসব অভিযোগকে অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও সর্বোচ্চ পেশাদারি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী এই প্রকল্পে সংঘটিত প্রতিটি দুর্নীতির শিকড় গভীরভাবে অনুসন্ধান করে বের করা হবে।
যারা নিজেদের হীন ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রের এত বড় একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের প্রকল্পে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাব ও নকশায় অযৌক্তিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নির্মাণের বিভিন্ন ধাপে ভুয়া ব্যয়ের হিসাব দেখিয়ে বা নকশায় অপ্রয়োজনীয় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিবর্তন এনে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার যে অভিযোগগুলো জনসমক্ষে এসেছে, তা রাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কারা এই ধরনের ভুয়া ব্যয়ের হিসাব বা মিথ্যা পরিবর্তন তৈরি করেছে, কোন কোন খাতে ঠিক কত টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং এই বিশাল দুর্নীতির সঙ্গে কারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, তার সবকিছুই একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনগণের কষ্টার্জিত করের টাকার প্রতিটি পয়সার হিসাব নেওয়া হবে এবং যারা এই অর্থ লোপাটের সঙ্গে যুক্ত, তাদের পরিচয়, পদবি বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা যাই হোক না কেন, তাদের প্রত্যেককে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।
দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে প্রশাসনিকভাবে কোনো ধরনের সমঝোতা বা আপস-মীমাংসা হবে কি না, উপস্থিত সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন মনোভাব ব্যক্ত করেন।
তিনি সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন যে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনো পারস্পরিক আপস-মীমাংসার আইনি বা নৈতিক সুযোগ নেই।
যাদের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির ন্যূনতম সম্পৃক্ততা বা প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনি কাঠামোর আওতায় সর্বোচ্চ ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো প্রভাবশালীর অবৈধ হস্তক্ষেপ বা অনৈতিক চাপ এই বিচার প্রক্রিয়াকে সামান্যতম ব্যাহত করতে পারবে না বলে তিনি দেশবাসীকে সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই কঠোর বার্তা দেশের অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও একটি যুগান্তকারী সতর্কতা হিসেবে কাজ করবে। বিগত বছরগুলোতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যে চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়েছিল, তা দূর করে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসিত প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বর্তমান প্রতিমন্ত্রীর এই ঘোষণা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও এটি একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে যে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসন যেকোনো ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করছে।
বিমান পরিবহন খাতের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানের সেবামূলক জায়গায় দুর্নীতি প্রতিরোধ করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশাল ভূমিকা রাখবে। এখন সবার দৃষ্টি থাকবে সরকারের এই তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয় এবং প্রকৃত অপরাধীরা কীভাবে আইনের জালে ধরা পড়ে, তার ওপর।