তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দেশের আপামর জনসাধারণ তীব্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে; এখন বর্তমান সরকারও যদি পুনরায় সেই একই ফ্যাসিবাদের পথ অনুসরণ করে, তবে দেশের জনগণ তাদেরও ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করবে না।
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা ময়দানে এগারো দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সময়োপযোগী মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের চূড়ান্ত গণরায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন এবং গত জুলাই মাসে সংঘটিত বর্বরোচিত গণহত্যার মূল নির্দেশদাতা হিসেবে শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার সুনির্দিষ্ট দাবিতে মূলত বৃহত্তর সিলেট বিভাগীয় এই মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল।
এই সমাবেশে লাখো জনতার উদ্দেশে দেওয়া দীর্ঘ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে জামায়াতের আমির দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের প্রত্যাশা এবং ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা নিয়ে গভীর ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন।
জনগণের প্রত্যাশা ও গণভোটের রায়ের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিনি ও তার দলের নেতারা ইতিমধ্যে সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে সফর করেছেন এবং দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের মনোভাব গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, দলমত নির্বিশেষে বর্তমানে দেশের প্রতিটি মানুষের একটাই অভিন্ন ও জোরালো দাবি, আর তা হলো গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সুস্পষ্ট রায় প্রদান করেছে, বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে তার শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
ক্ষমতাসীনদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সরকারি দল এবং বিরোধী দল উভয়েই দেশব্যাপী সাধারণ জনগণের কাছে গিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেছিল। জনগণকে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছিল এবং দেশের সাধারণ মানুষ সেই আহ্বানে বিপুলভাবে সাড়া দিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন নিশ্চিত করেছে।
তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, এখন সেই প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত বাস্তবায়নের সময় এসেছে এবং এই রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ধরনের টালবাহানা বা অজুহাত দেশের সচেতন জনগণ আর কিছুতেই মেনে নেবে না।
দেশের কাঠামোগত ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, দেশের সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল পরিবর্তনের জন্য, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দুর্নীতির অবসানের জন্য এবং একটি অর্থবহ সংস্কারের পক্ষেই গণভোটে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পবিত্র রায় প্রদান করেছে।
সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, দেশের প্রায় সত্তর ভাগ মানুষ সুস্পষ্টভাবে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। জনগণের এই বিপুল ম্যান্ডেট বা ঐতিহাসিক গণভোটকে কোনোভাবেই অপমানিত বা অবমূল্যায়ন করতে দেওয়া হবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তিনি প্রবল আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, স্রষ্টার অশেষ রহমতে গণভোটের এই রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই তাদের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক আন্দোলন সফলতার চূড়ান্ত দ্বারপ্রান্তে উপনীত হবে।
বর্তমান সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় এই শীর্ষ নেতা বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে জনগণ আর কখনোই কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদ, স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের উত্থান দেখতে চায় না।
অত্যন্ত আক্ষেপ ও গভীর দুঃখের সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে যারা সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, অতীতের শাসনামলে তারাও একসময় চরমভাবে মজলুম বা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার ছিলেন।
কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, ক্ষমতার কেন্দ্রে আসীন হওয়ার পর তারা নিজেদের সেই অতীত রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কথা সম্পূর্ণ ভুলে গেছেন। সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের বদলে তারা এখন সেই পতিত স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের দেখানো ফ্যাসিবাদী ও অগণতান্ত্রিক পথ ধরেই নতুন করে হাঁটতে শুরু করেছেন বলে তিনি তীব্র অভিযোগ উত্থাপন করেন।
তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তারা এখন অত্যন্ত বেপরোয়া ও নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সুকৌশলে দেশের সর্বগ্রাসী দুর্নীতিকে জাতীয়করণ করার এক ভয়ংকর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন, যা দেশের দেশপ্রেমিক নাগরিক সমাজ কিছুতেই নীরবে মেনে নেবে না।
তিনি বর্তমান সরকারকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, দেশের ছাত্র-জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে শেখ হাসিনার মতো এক ভয়ংকর স্বৈরশাসককে ক্ষমতা থেকে তাড়িয়েছে। এখন যদি নতুন করে কেউ ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করতে চায়, তবে জনগণ তাদেরও ছেড়ে কথা বলবে না।
তিনি ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে বলেন, তারা যেন সামগ্রিক পরিস্থিতি অনুধাবন করে ভালোয় ভালোয় জনগণের যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবিগুলো অবিলম্বে মেনে নেয়। আর যদি তারা জনগণের এই রায়কে উপেক্ষা করার ধৃষ্টতা দেখায়, তবে তাদের মনে রাখা উচিত যে, এই দেশের অকুতোভয় মানুষ জীবন দিয়ে, চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করে এবং সরাসরি বুকের ওপর গুলি খেয়ে হাসিমুখে শিখে নিয়েছে কীভাবে মুক্তির কণ্টকাকীর্ণ পথে অবিচলভাবে হাঁটতে হয়।
ভাষণের একেবারে শেষাংশে জামায়াতের আমির এক অত্যন্ত আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেন। তিনি পরম করুণাময়ের কাছে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে বলেন, তারা কোনো অবস্থাতেই জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারী শহীদদের পবিত্র রক্তের সঙ্গে ন্যূনতম বেইমানি করবেন না।
যারা সেই উত্তাল দিনগুলোতে বুক চিতিয়ে রাজপথে লড়াই করেছেন, সেই অকুতোভয় জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে বেইমানি করা হবে না। সর্বোপরি, দেশের আঠারো কোটি সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক আপস করা হবে না।
তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, নিজেদের জীবন দিয়ে হলেও তারা রাজপথে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যাবেন এবং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। জনগণকে আগামী দিনের আরও বৃহত্তর ও চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য এখন থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য রাজধানী ঢাকার রাজপথে নামার ডাক আসবে।
সেই কঠিন ও চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য দেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এবং ঘরে ঘরে এখন থেকেই প্রতিরোধের দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। দেশ থেকে ফ্যাসিবাদের সর্বশেষ শিকড়, বেপরোয়া চাঁদাবাজ, লুটেরা দুর্নীতিবাজ এবং সকল প্রকার দুঃশাসনের চিরতরে অবসান না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই আপসহীন লড়াই দিন দিন কেবল তীব্র থেকে আরও তীব্রতর হবে।
কাঙ্ক্ষিত মুক্তির চূড়ান্ত মঞ্জিলে না পৌঁছানো পর্যন্ত স্বাধীনতাকামী এই অদম্য জনতার আন্দোলন এক মুহূর্তের জন্যও থামবে না বলে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ সমাপ্ত করেন।