এই চাঞ্চল্যকর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদসহ মোট এগারো জনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আদালত।
একই সঙ্গে অভিযুক্তদের মধ্যে আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং কারাগারে থাকা অপর তিনজনকে আগামী দিনে আদালতে হাজির করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেল এই তাৎপর্যপূর্ণ আদেশ প্রদান করে, যা দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিচার ব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, একটি নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে বিচার করার এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, অতীত সরকারগুলোর আমলে সংঘটিত রাষ্ট্রীয় বিচারবহির্ভূত খুনের ঘটনাগুলোকে এখন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি বিচারিক প্যানেল রবিবার এই আদেশ দেন। এই প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এদিন আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জহিরুল আমিন শুনানিতে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বিচারকদের সামনে এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিস্তারিত অভিযোগ তুলে ধরেন এবং আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র আমলে নেওয়ার জন্য আইনি আবেদন পেশ করেন।
আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে গ্রহণ করেন। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ট্রাইব্যুনাল অন্য মামলায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার থাকা আসামিদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেন এবং যারা এখনো পলাতক রয়েছেন, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করেন।
মামলাটির পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী পঁচিশে আগস্ট দিন ধার্য করা হয়েছে। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, এই চাঞ্চল্যকর মামলায় অভিযুক্ত এগারো জনের তালিকায় রয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন সাবেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
আসামিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ।
এছাড়া সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম, সেনাবাহিনীতে কর্মরত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন, অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে থাকা কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, মেজর রুহুল আমিন, সেনা কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব, সেনা কর্মকর্তা আশিকুর রহমান এবং টেকনাফের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি।
এদের মধ্যে আবদুর রহমান বদি, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহাবুব আলম বর্তমানে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে বন্দি রয়েছেন, যাদেরকে আগামী শুনানিতে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই দিন সকালেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিবন্ধকের কাছে এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছিল।
মামলার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালের ছাব্বিশে মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানের নামে একটি কথিত বন্দুকযুদ্ধে নির্মমভাবে নিহত হন একরামুল হক।
নিহত একরামুল হক ছিলেন টেকনাফ পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা কাউন্সিলর এবং উপজেলা যুবলীগের সভাপতি। এই হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে, বিশেষ করে যখন একরামুল হকের মৃত্যুর সময়কার একটি হৃদয়বিদারক শব্দের ধারণ বা অডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ওই বার্তায় তার শিশু কন্যার করুন আর্তনাদ পুরো দেশের মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। মানবাধিকার কর্মীরা তখন থেকেই এটিকে একটি পরিকল্পিত ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছিলেন। তাদের মতে, এটি নিছক কোনো আইনশৃঙ্খলাজনিত ঘটনা ছিল না, বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি নির্লজ্জ দৃষ্টান্ত ছিল।
বছরের পর বছর ধরে নিহতের পরিবার সুবিচারের আশায় দীর্ঘ প্রহর পার করেছে, কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিচার প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘ সময় পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে শুরু হওয়ায় ন্যায়বিচার পাওয়ার একটি নতুন ও জোরালো আশা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের এই বিচারিক তৎপরতাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া কথিত বন্দুকযুদ্ধের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত ও বিচার দাবি করে আসছিল বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী।
সেই প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এই আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।