রবিবার, জুলাই ২৬, ২০২৬
১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ পর্যালোচনা করছে সরকার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ পর্যালোচনা করছে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে বর্তমান সরকার। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে যেসব আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে।

 

তদন্ত কার্যক্রম সমাপ্ত হওয়ার পর সার্বিক জনস্বার্থ বিবেচনা করে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

 

রোববার (২৬ জুলাই ২০২৬) দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত নবীন আইনজীবীদের বরণ ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতো বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন থাকা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগের তদন্ত দেশের রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোতে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, যা জবাবদিহিতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

 

আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রাষ্ট্র বা সরকার কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অবিচার করতে চায় না। তবে রাষ্ট্রের সর্বত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যে সমস্ত গুরুতর অভিযোগ গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সচেতন মহলে আলোচিত হচ্ছে, নিরপেক্ষভাবে সেগুলোর প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।

 

তদন্ত প্রক্রিয়ায় যদি এসব অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠ ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত করা হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার এই বার্তাই দিতে চায় যে, অপরাধী বা অভিযুক্ত ব্যক্তি যেই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।

 

অন্যদিকে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখেই পরবর্তী সকল কার্যক্রম পরিচালিত হবে। দেশের সংবিধানের নির্দেশিত পথেই সরকার নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।

 

সমসাময়িক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে আইনমন্ত্রী এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, বিগত ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বিপুল অর্থ সুকৌশলে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

 

এই পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ দেশের দুই থেকে তিনটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেটের সমপরিমাণ, যা উন্নয়নশীল একটি দেশের অর্থনীতির জন্য এক অপূরণীয় ও ধ্বংসাত্মক ক্ষতি। সরকারি কোষাগার ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ কীভাবে লাগামহীনভাবে লুটপাট হয়েছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ টানতে গিয়ে তিনি খুলনার একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন।

 

সেখানে মাত্র পৌনে চার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সাধারণ সড়ক নির্মাণের জন্য ২৮০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্ক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া, পিরোজপুর জেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পে বাস্তব কোনো অবকাঠামোগত কাজ না করেই কেবল কাগজে-কলমে উন্নয়নের মিথ্যা চিত্র দেখিয়ে জনগণের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তিনি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।

 

দেশের বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সর্বস্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রসঙ্গেও আইনমন্ত্রী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত মামলাগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, পূর্বের তুলনায় বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়েরের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।

 

এটি বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ কর্মশালায় প্রায় এক হাজার ৫৪ জন নবীন আইনজীবী অংশগ্রহণ করেন, যা আইনি পেশায় নতুন প্রজন্মের ব্যাপক আগ্রহ ও প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।

 

নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে গঠনমূলক দিকনির্দেশনা দিতে গিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, আইন পেশায় সফলতার কোনো সংক্ষিপ্ত বা সহজ পথ নেই। নিরলস অধ্যয়ন, গভীর আইনি জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন, সততা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় মানসিকতা নিয়েই এই মহান পেশায় সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

 

তিনি উপস্থিত আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং পেশার মর্যাদা সমুন্নত রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। পরিশেষে, তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক আপসহীন ও কঠোর অবস্থান গ্রহণের জন্য সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

 

দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি যদি নিজের রাজনৈতিক দলের বা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কেউও হয়, তবুও তার বিরুদ্ধে কঠোর, নির্মোহ ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে বলে তিনি নবীন আইনজীবীদের উৎসাহিত করেন, যা একটি সুস্থ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।