ড. ইউনূস বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৬৭ সালের সীমানা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি টেকসই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই এই দীর্ঘদিনের সংঘাত নিরসনের একমাত্র পথ। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বার্তায় ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতি বাংলাদেশের ধারাবাহিক সমর্থনের কথা তুলে ধরেন। তিনি গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অবমাননার তীব্র নিন্দা জানান।
বিশেষ করে নারী ও শিশু হত্যা, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বিচার হামলা, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার মতো ঘটনাগুলোকে তিনি ইতিহাসের অন্যতম জঘন্যতম অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন। ইসরায়েলি দখলদারিত্বের ফলে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অধ্যাপক ইউনূস ফিলিস্তিনিদের এই সংগ্রামের সাথে বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাসের গভীর যোগসূত্রের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের জন্য যে সংগ্রাম হয়েছিল, তার চেতনা থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি আমাদের এই সমর্থন উৎসারিত। তিনি গত বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও টেনে আনেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন, বাকস্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদার পক্ষে যে ঐক্যবদ্ধ স্বর তুলেছে, তা নিপীড়ন ও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই একই চেতনা ফিলিস্তিনিদের মুক্তির সংগ্রামে সংহতি প্রকাশে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি প্রচেষ্টার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ বন্ধে চলমান আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানান।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর দ্বারা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের খবরে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, যেসব দেশ ইসরায়েলের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সমর্থন দিয়ে আসছে, তারা তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে এবং শান্তির পক্ষে অবস্থান নেবে। এছাড়াও, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এর সাম্প্রতিক প্রচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানান ড. ইউনূস।
তিনি একে আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সনদ এবং নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেন। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারের দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানান।
পরিশেষে, যেসব দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাদের সাধুবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যেসব দেশ এখনও স্বীকৃতি দেয়নি, তারা দ্রুতই এই ন্যায্য দাবির পক্ষে এগিয়ে আসবে। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বাস্তবায়ন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকারের স্বীকৃতিই মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার একমাত্র উপায়। এই সংকটময় মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।